বিজ্ঞাপন
অদম্য এই মানুষটির নাম হযরত আলী। জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের দুর্গম ডিগ্রীরচর খলিফাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি। সাত সন্তানের জনক হযরত আলীর জীবনে দারিদ্র্য ছিল আজন্ম সঙ্গী। দীর্ঘ জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে শরীর এখন অনেকটাই বেঁকে গেছে, পায়ে আর আগের মতো জোর নেই। চোখেও ভর করেছে বার্ধক্যের ঝাপসা দৃষ্টি। দুই পায়ে ভর করে ঠিকমতো দাঁড়াতে না পারলেও থেমে থাকার সুযোগ নেই তাঁর।
নিজের জীবনসংগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে হযরত আলী বলেন, “শরীরে আর আগের মতো বল পাই নে, বয়স হয়ে গেছে। সাইকেল চালানোর ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়েছি। কিন্তু এই সাইকেলে ভর দিয়েই কোনোমতে পথ হাঁটি। ঘরে অসুস্থ স্ত্রী, তার খাবারের ব্যবস্থা করতে তো আমাকে বের হতেই হবে।”
জীবনের শুরু থেকেই চরম অনটন ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কখনো অন্যের জমিতে দিনমজুরি, আবার কখনো বর্গাচাষ করে দিনরাত ঘাম ঝরিয়েছেন। সেই সামান্য উপার্জনেই তিল তিল করে বড় করেছেন এক ছেলে ও ছয় মেয়েকে। শত অভাবের মাঝেও কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি, মাথা নত করেননি পরিস্থিতির কাছে। সন্তানদের বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি একাকী। একমাত্র ছেলে জীবিকার তাগিদে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাজধানীতে বসবাস করেন। মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গেছে দূর-দূরান্তে। ফলে বার্ধক্যে এসে হযরত আলী ও তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিজেদের আহারের সংস্থান করতে হচ্ছে নিজেদেরই।
অভাবের তাড়নায় আজও তিনি থেমে যাননি। অন্যের কাছ থেকে সামান্য কিছু জমি বন্ধক নিয়ে তাতে সবজি চাষ করেন। সেই খেতের ফলন সাইকেলে ঝুলিয়ে স্থানীয় হাটে নিয়ে যান বিক্রির উদ্দেশ্যে। দিনশেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনে ঘরে ফেরেন। কোনোদিন বিক্রি ভালো হলে দুবেলা খাবার জোটে, আবার কোনোদিন শূন্য হাতে অনাহারে-অর্ধাহারে রাত কাটাতে হয় এই বৃদ্ধ দম্পতিকে।
হযরত আলীর স্বপ্ন এখন আর আকাশচুম্বী নয়। শেষ বয়সে একটু শান্তি আর স্ত্রীকে নিয়ে দুবেলা পেট ভরে ভাত খাওয়ার নিশ্চয়তা চান তিনি। জীবনের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে ভর করে তাঁর ধীরগতির এই পথচলা সমাজের তথাকথিত উন্নয়ন ও মানবিকতার সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...