Logo Logo

নেত্রকোনায় ৮ মাসে পানিতে ডুবে ৮২ জনের মৃত্যু, ৯৫ শতাংশই শিশু


Splash Image

নেত্রকোনায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পানিতে ডুবে ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই শিশু। জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে, জুন ও আগস্ট মাসে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। এ অবস্থায় শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।


বিজ্ঞাপন


জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে পানিতে ডুবে মারা গেছে তিনজন, ফেব্রুয়ারিতে কোনো মৃত্যু হয়নি, মার্চে চারজন, এপ্রিলে ছয়জন, মে মাসে ১৫ জন, জুনে ২৭ জন, জুলাইয়ে নয়জন এবং আগস্টে ১৮ জন। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে কলমাকান্দায় এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে জানা গেছে।

নেত্রকোনা জেলা নদী, নালা, খাল-বিল ও হাওরবেষ্টিত হওয়ায় বর্ষাকালে জেলার গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বাড়ির আশপাশে পানি জমে যায়। অনেক বাড়ির উঠান পেরোলেই রয়েছে পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা জলাশয়। ফলে খেলতে গিয়ে কিংবা পরিবারের সদস্যদের অগোচরে এসব জলাশয়ে পড়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশের বয়স এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কৃষিকাজ বা অন্য পেশাগত কাজে বাইরে এবং মায়েরা রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন। এ সময় শিশুরা পরিবারের সদস্যদের অগোচরে বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা, নালা কিংবা খালের পানিতে পড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে শুধু সাঁতার শেখানোই যথেষ্ট নয়; শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় নিরাপদ করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। বিশেষ করে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সচেতন মহলের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও এনজিওর পক্ষ থেকে শিশুদের সাঁতার শেখানো ও পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এসব কার্যক্রমের দৃশ্যমানতা সীমিত। তারা মনে করেন, প্রকল্পভিত্তিক বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের পরিবর্তে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

নেত্রকোনা জনউদ্যোগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বলেন, নেত্রকোনা নদী, নালা, খাল-বিল ও হাওরবেষ্টিত জেলা। বর্ষাকালে জেলার চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে থাকায় অনেক সময় মায়েদের একাই সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব সামলাতে হয়। গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে শিশুরা অগোচরে পানিতে পড়ে যায়।

তিনি বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে গ্রামে গ্রামে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার। পাশাপাশি শিশুদের দেখভালের জন্য গ্রামভিত্তিক দিবা যত্নকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। বাড়ির সামনে পুকুর বা ডোবা থাকলে বাঁশের খুঁটি, নেট বা অন্য কোনো উপায়ে সেগুলো ঘেরাও করে শিশুদের নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের সাঁতার শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে প্রতিটি উপজেলায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে মতবিনিময় সভাও হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভা করে এ বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের সাঁতার শেখানোর জন্য স্থানীয় পুকুরগুলো কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পানিতে ডুবে মৃত্যুর হাত থেকে শিশুদের কীভাবে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা নয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ শিশুযত্নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...