বিজ্ঞাপন
চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাসের শেষ দিকে বুশরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, অনেক সময় মাথা সোজা করে রাখাও কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু অসুস্থতা তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং অদম্য আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও নিজের প্রতি বিশ্বাসকে শক্তি করে সে এগিয়ে গেছে স্বপ্নপূরণের পথে।
২০২৪ সালের ৫ জুলাই বুশরার ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয়। এরপর থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দুরারোগ্য এই ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছে সে। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকলেও একাই পড়াশোনা চালিয়ে গেছে এবং নিজের চেষ্টায় এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে।
চিকিৎসকেরা তাকে বিশেষ সুবিধায় হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে বুশরা চেয়েছিল অন্য সবার মতো পরীক্ষার হলে বসে সমান সুযোগে পরীক্ষা দিতে। শেষ পর্যন্ত তার সেই প্রত্যয়ই বাস্তব হয়েছে। হাসপাতালে শুয়ে নয়, সবার মতো পরীক্ষার হলে বসেই পরীক্ষা দিয়েছে সে এবং পেয়েছে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বরসহ জিপিএ-৫।
বুশরা মেহজাবীন বলেন, “ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ার পর জীবনের একটা কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে, নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। অনেক সময় শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়তাম যে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে যেত। তারপরও আমি কখনো মনে করিনি যে অসুস্থতার কারণে আমার স্বপ্ন থেমে যাবে।”
সে আরও বলে, “চিকিৎসক আমাকে হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম অন্য সবার মতো পরীক্ষার হলে বসেই পরীক্ষা দিতে। কারণ আমি মনে করি, নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে কঠিন পরিস্থিতিও জয় করা সম্ভব। তাই যতটা পেরেছি নিজের মতো করে পড়াশোনা করেছি এবং পরীক্ষা দিয়েছি। জিপিএ-৫ পাওয়ার পর আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার মা-বাবার মুখের হাসি দেখে।”
জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে নিজের অনুভূতি জানিয়ে বুশরা বলে, “প্রথম আলোর এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে আমার অনেক ভালো লাগছে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, গল্প করেছি, ছবি তুলেছি। কয়েক দিন ধরে এই অনুষ্ঠানটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার মতো যারা কোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের বলতে চাই—হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অসুস্থতা বা কোনো বাধাই যেন আমাদের স্বপ্নের পথে থামিয়ে না দেয়। আমি ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করতে চাই এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।”
বুশরার মা মেহেরুন্নেছা বলেন, প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে তার মেয়ের শারীরিক সব কষ্ট যেন দূর হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানে এসে বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে বুশরা। কয়েক দিন ধরেই মেয়েটি অনুষ্ঠানটি নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।
শনিবার রাত থেকেই যেন বুশরার অপেক্ষার শেষ হচ্ছিল না। রোববার সকালে মাকে তাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে মায়ের সঙ্গে চলে আসে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে। সেখানে প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ড, কেমোথেরাপি ও চিকিৎসার কষ্ট। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, হইহুল্লোড় ও সেলফিতে মেতে ওঠে সে।
প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় রোববার সকালে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাঁঠালিয়ার আমুয়া থেকে রাহায়ে রুহানি, রাজাপুর থেকে প্রিয়াংকা বিশ্বাস এবং নলছিটির সুগন্ধা নদী পাড়ি দিয়ে নাফিজা ইসলাম অংশ নেয়। কাঁঠালিয়ার আমুয়া থেকে আসা রাহায়ে রুহানি বলেন, প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য গত তিন দিনে কোথাও বেড়াতে যায়নি। প্রথমবারের মতো এমন কোনো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়ে তার খুব ভালো লাগছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এর আগে সকালে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার। দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ। কেউ মা-বাবার হাত ধরে, কেউ ভাইবোন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠানে আসে। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হয়ে কেউ আলিঙ্গনে, কেউ গল্পে, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যস্ত ছিল ছবিতে।
ঝালকাঠি বন্ধুসভার সভাপতি শাকিল হাওলাদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর ঝালকাঠি প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান। পরে অতিথিদের মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আগামীর বাংলাদেশের জন্য যে প্রজন্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন, প্রথম আলো তাদের অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মানুষের কল্যাণ ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিজেদের মেধা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি আক্কাস সিকদার বলেন, এমনভাবে নিজেদের তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের জ্ঞান ও মেধা পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাজে আসে।
অনুষ্ঠানে আলোচনা, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণী পর্বের পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, শিক্ষার্থীদের গল্প ও আবৃত্তিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মঞ্চ।
ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ইলিয়াস ব্যাপারী বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাই চূড়ান্ত সফলতা নয়। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ, নির্মোহ মানুষ, নিবেদিত, মানবিক ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। তাই শিক্ষার্থীদের আরও বেশি মনোযোগী ও পরিশ্রমী হতে হবে। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়াই জীবনের বড় অর্জন নয়; একজন আলোকিত মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ, ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পবিত্র কুমার দাস এবং প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিক্ষক হামিদা খানম।
এদিন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান শিক্ষার্থীদের ‘তিন ম’—মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থ—থেকে দূরে থাকার শপথ পড়ান। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
তবে পুরো আয়োজনের ভিড়েও বুশরা মেহজাবীনের গল্পটি ছিল আলাদা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেও যে কিশোরী পড়াশোনা চালিয়ে গেছে, হাসপাতালের বিছানায় নয় বরং সবার মতো পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিয়েছে, তার জিপিএ-৫ যেন কেবল একটি ফল নয়—এটি স্বপ্নের কাছে অসুস্থতার পরাজয়ের প্রতীক।
বুশরার মতো দেড় শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থীকে ঘিরে এদিন ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ পরিণত হয় স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস ও সম্ভাবনার এক মিলনমেলায়। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’—এই বার্তাকে সামনে রেখে সংবর্ধিত শিক্ষার্থীরা নতুন প্রত্যয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েই অনুষ্ঠানস্থল থেকে ফিরে যায়।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...