বিজ্ঞাপন
সাধারণত রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শনিবার থেকেই নয়াদিল্লিতে সপ্তাহান্তের ছুটির আমেজ শুরু হয়। তবে এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিক্ষোভ ঘিরে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরে পৌঁছানো ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ।
বিক্ষোভে দিল্লি ও আশপাশের এলাকা এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে লোকজনের অংশগ্রহণ ঠেকাতে শনিবার রাজধানীর ৪৫টি মেট্রোস্টেশনের সবগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাতিল করা হয়েছে ২৫০টি ট্রেন।
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতির আবেদন আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে দিল্লি পুলিশ। প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, অতীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিশাল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা সত্ত্বেও সিজেপির কর্মসূচি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে।
বিক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়া ও আন্দোলনকারীদের সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত যন্তর মন্তরের জনপথ-কর্তব্য পথ সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল এ নির্দেশ জারি করেছে।
নির্দেশটি সব ধরনের মোবাইল ইন্টারনেট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সে অনুযায়ী এয়ারটেল, জিও, ভিআই ও এমটিএনএলকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিষেবা স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।
সিজেপির সম্ভাব্য বিক্ষোভ কর্মসূচি সামনে রেখে ভারতের সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব গোবিন্দ মোহন।
গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) পাঠানো ওই চিঠিতে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অনুমতি না থাকলেও সিজেপির সদস্য ও সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সীমান্ত তদারককারী কর্তৃপক্ষকে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা এবং নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর সীমান্ত এলাকাগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দিল্লিতে প্রবেশকারী যানবাহনের ওপর বাড়ানো হয়েছে নজরদারি ও তল্লাশি। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শনিবার মদের দোকান ও পানশালা বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশন ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরকে ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া সড়কগুলোতে বসানো হয়েছে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সহজ করতে নিউ দিল্লি জেলাকে ২০টিরও বেশি জোনে ভাগ করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশকে সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) ১২০টিরও বেশি কোম্পানি মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিআরপিএফ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করতে বিভিন্ন স্থানে পরিচালনা করা হয়েছে মহড়া।
বিক্ষোভে অংশ নিতে লোকজনকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কড়া নজর রাখছে পুলিশ। প্রস্তাবিত সমাবেশকে ঘিরে প্রকাশিত অনলাইন পোস্ট ও বার্তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০০ জনেরও বেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটর পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছেন।
এ ছাড়া রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানগুলোতে অডিও-ভিডিও ধারণের সুবিধাসহ ৩০০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য বডি ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি এবং পুলিশের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে নথিবদ্ধ করতে প্রায় ১০০ জন ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভ চলাকালে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য যন্তর মন্তরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ১২টি অস্থায়ী আটক কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে দিল্লি পুলিশ। পাশাপাশি নতুন দিল্লি ও মধ্য দিল্লির হোটেল, লজ ও গেস্ট হাউসগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
আবাসন প্রদানকারীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এয়ারবিএনবি পরিচালনাকারী এবং বাড়ির মালিকদেরও।
সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে জনগণকে জানানো হচ্ছে, বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অননুমোদিত জমায়েত, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সংযত আচরণ ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উসকানিতে সাড়া না দেওয়া এবং অতীতে সিজেপির বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোর মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে দিল্লি পুলিশ। এর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জানানো হচ্ছে, প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচির কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে সিজেপির ঘোষিত মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করেছে প্রশাসন। বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, গণপরিবহনে বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য জনসমাগম ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...