বিজ্ঞাপন
শীতের অতিথিদের দেখতে প্রতিদিনই দিঘির পাড়ে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। তাদের মধ্যে কেউ মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ভিডিও করছেন পাখির উড়ে চলার দৃশ্য, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিলেন প্রকৃতির এই অপূর্ব আয়োজন।
যেখানে সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে সকালের আলো ফুটতেই যেন বদলে যায় উলুপুর দিঘির পরিবেশ।চারপাশে সবুজের সমারোহ। হঠাৎ আকাশ জুড়ে ডানার ঝাপটানি তারপরই ভেসে আসে কিচিরমিচির শব্দ।
কেউ পানিতে খাবার খুঁজছে, কেউ গাছের ডালে বসে আছে, আবার কেউ দল বেঁধে উড়ছে নীল আকাশে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সবুজের বুকের ওপর কেউ যেন জীবন্ত কোনো ছবি এঁকে দিয়েছে। এই দিঘি যেন হয়ে উঠেছে হাজারো পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল। বিশ্বের শীতপ্রধান নানা দেশ থেকে পাখি গুলো প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এসেছে এই দীঘিতে।
শুধু উলুপুর দিঘি নয়, তাড়াশের বিস্তীর্ণ চলনবিলও পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। শীত মৌসুমে বিলের জলাভূমিতে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখির। সোলি, বদর, লালমোন, শামুকখোল, বক, বালিহাঁসসহ বিভিন্ন পাখির আনাগোনায় প্রাণ ফিরে পায় বিল ও দিঘিগুলো। জলজ খাবারের সহজলভ্যতা এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে প্রতিবছর শীত মৌসুমে এসব এলাকায় পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এমনটি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিল ও দিঘির দেশি ছোট ছোট মাছই মূলত এসব পাখির প্রধান খাদ্য।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী মোঃ রাঙ্গা হোসাইন দৈনিক ভোরের বাণীকে বলেন, উলুপুর দিঘির চারপাশের গাছপালা পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। এই পরিবেশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে এখানে আরো বেশি পাখির সমাগম ঘটবে।
পাখি প্রেমী মোঃ আবুল কালাম আজাদ দৈনিক ভোরের বাণীকে বলেন, হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে অস্থায়ী আবাস গড়ে তোলে পরিযায়ী পাখি। পাখির বিচরণ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সারাক্ষণ পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত চারপাশ। যা দেখে খুবই ভালো লাগলো।
তার প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। সেই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণে সবার সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
জানা যায়, এসব অতিথি পাখির আগমন ঘটে উত্তর মেরু থেকে। পৃথিবীর উত্তর মেরুর দেশ সাইবেরিয়া, ফিলিপস, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, এন্টার্কটিকাসহ অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা যখন মাইনাস শূন্য ডিগ্রিতে নেমে আসে, তখন সেগুলোতে দেখা দেয় প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। তীব্র শীতে পাখির দেহ থেকে পালক খসে পড়ে।
প্রকৃতি যখন পাখিদের জীবনধারণের জন্য অনুকূলে থাকে না, তখন পাখিগুলো অপেক্ষাকৃত কম শীত ও অনুকূল প্রকৃতির দেশে অতিথি হয়ে আসে।
নাতিশীতোষ্ণ দেশ হিসেবে এ দেশ প্রতিবছর সাদরে গ্রহণ করে নেয় এসব অতিথি পাখিকে। এ দেশ হয়ে ওঠে তখন অতিথি পাখিদের খাদ্য ও জীবনধারণের নিরাপদ আবাসস্থল।
প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে ৭৪৪ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে ৩০১ প্রজাতি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে বলে এদের আবাসিক পাখি বলা হয়। খণ্ডকালীন সময়ে নিয়মিতভাবে আসে ১৭৬ প্রজাতির পাখি, যা বাংলাদেশের অতিথি পাখি হিসেবে গণ্য।
এ দেশে অতিথি পাখিদের আগমন শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-এ দুই মাসে বেশি পাখি আসে এ দেশে। এ সময়টিতে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে দেখা মেলে অতিথি পাখিদের। এসব অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকে পুরো প্রকৃতি। এক মোহনীয় রূপ ধারণ করে হাওরাঞ্চলগুলো।
একদিকে দীঘিতে শান্ত জলরাশি, অন্যদিকে সবুজের সমারোহ-তারই মাঝে হাজারো পাখির কলকাকলি। সব মিলিয়ে উলুপুর দিঘির পাড় এখন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি ও পাখির এক অপূর্ব মিলনমেলা। পাখিদের এই নিরাপদ বিচরণ যেন প্রতিবছর আরও সমৃদ্ধ হয় এবং উলুপুর দিঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকে-এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...