Logo Logo

নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছেছেন সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকরা


Splash Image

সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ও সহযোগিতায় সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের বহনকারী গাড়িবহর নিরাপদে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১টার দিকে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছায়।


বিজ্ঞাপন


এর আগে সকাল পৌনে ৯টার দিকে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হন পর্যটকেরা। পথে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধের মুখে পড়লেও সেনাবাহিনীর এসকর্টে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছান তারা।

পর্যটকেরা জানান, সাজেকে চলমান আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের কারণে তারা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। ফেরার পথে কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে এ ঘটনায় কোনো পর্যটক হতাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

ঢাকা থেকে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক আবুল কাশেম বলেন, দুই রাত তিন দিনের ট্যুরে বুধবার তারা সাজেকে গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছে সন্ধ্যায় জানতে পারেন আন্দোলন চলছে। বৃহস্পতিবার তাদের সাজেক থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে অগ্রিম টাকা দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরতে হওয়ায় গাড়িভাড়ার বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকায় ফেরার বাসের টিকিটও দুই দিন পরের হওয়ায় বাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে বলে জানান তিনি।

অয়ন নামে আরেক পর্যটক জানান, সেনাবাহিনীর এসকর্টে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে আনা হয়। পথে দুটি স্থানে প্রায় আধাঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আন্দোলনকারীদের সড়ক অবরোধের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানান তিনি।

অয়ন বলেন, সেনাবাহিনী পর্যটকদের নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে এসেছে। পথে কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সড়কের ওপর অসংখ্য ভাঙা ইট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তবে পর্যটকদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

হবিগঞ্জ থেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক অপু বলেন, আনন্দ করতে সাজেকে গেলেও সেখানে গিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। বুধবার সাজেকে পৌঁছানোর পর আন্দোলনের কারণে ভালোভাবে ঘোরাফেরা করতে পারেননি। সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনের খবর শুনে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছেন তারা।

তিনি জানান, ফেরার পথে দুটি স্থানে তাদের গাড়িবহর আটকে যায়। গাড়িবহরের সামনে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি ছিল। আন্দোলনকারীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী অবরোধকারীদের সড়কের দুই পাশে ছত্রভঙ্গ করে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো দ্রুত ওই এলাকা পার করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে সাজেকে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে।

সাজেকে সড়ক অবরোধের কর্মসূচি পালন করছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠন। সংগঠন দুটি পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপ)-সমর্থিত বলে প্রচার রয়েছে।

অবরোধকারী সংগঠনগুলোর দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক থেকে আরেক আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-সন্তু গ্রুপ)-এর সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে পিসিজেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা সাজেকের কয়েকটি এলাকায় অবস্থান করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন।

তাদের ওই এলাকাগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার দাবিতে সংগঠন দুটি অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। তবে এ বিষয়ে আঞ্চলিক সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের কারণে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই সাজেক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে গাড়িভাড়া, অগ্রিম অর্থ এবং ফেরার বাসের টিকিট নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে।

আইএসপিআরের দাবি, রাঙামাটি জেলার আওতাধীন সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করেন। এর ফলে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সাজেকে ভ্রমণরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে বলে জানায় আইএসপিআর।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়।

আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পুনরায় পর্যটকবাহী যান চলাচলের ব্যবস্থা করে।

পরবর্তীতে সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।

পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলেও জানায় আইএসপিআর।

আইএসপিআরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে ওই অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলে জানা গেছে। স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

আইএসপিআর আরও জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়।

সংস্থাটির মতে, এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিরীহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক অবরোধ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।

ভবিষ্যতেও পার্বত্য অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...