বিজ্ঞাপন
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের মিঠাপানির মাছকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মমুখর হয়ে ওঠে শুঁটকিপল্লির চাতালগুলো। তবে কাঁচা মাছের সংকটে দিন দিন কমছে শুঁটকি উৎপাদন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলার ৬০টি শুঁটকি মহালে ৩০২ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা এক ধাক্কায় নেমে এসেছে মাত্র ১৮৫ টনে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। এতে যেমন কোটি কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনই চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলনবিলে প্রাকৃতিক নিয়মে রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত করা এসব বিষমুক্ত শুঁটকি দেশজুড়ে যেমন জনপ্রিয়, তেমনই সৈয়দপুর, নীলফামারী হয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। তাড়াশের মহিষলুটি, চাটমোহরের বোয়ালমারী ও নাটোরের সিংড়া বাজার থেকে পাইকারি কাঁচা মাছ কেনা হয়। পরে চাতালে পুঁটি, শোল, বোয়াল, খোলসা, টাকি, টেংরা ও চাঁদাসহ নানা জাতের দেশীয় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সরেজমিনে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের মহিষলুটি শুঁটকিপল্লিতে গিয়ে দেখা যায় এক নীরব ও স্তব্ধ চিত্র। মহাসড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি চাতাল থাকলেও অধিকাংশ খাঁ-খাঁ করছে। মাছের অভাবে চাতালগুলোতে বাঁশের তৈরি চাটাই গুটিয়ে রাখা হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি চাতালে সামান্য কিছু পুঁটি মাছ শুকাতে দেখা গেছে। কাজ না থাকায় চাতাল মালিক ও শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন।
মহিষলুটি এলাকার চাতাল মালিক মোঃ আলী আসলাম জানান, গত বছরের চেয়ে এ বছর বিলের মাছের আমদানি অর্ধেকেরও কম। চড়া দামে কাঁচা মাছ কিনলেও শুঁটকির মোকামে গিয়ে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দাম না পাওয়ায় এবার চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। একই আক্ষেপ প্রকাশ করে মান্নান নগর এলাকার ব্যবসায়ী মোঃ আব্দুস সালাম বলেন, মাছের অভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ চাতাল বন্ধ রয়েছে, যার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬ হাজার শ্রমজীবী মানুষ তীব্র আর্থিক কষ্টে পড়েছেন।
এদিকে মান্নান নগর মৎস্য আড়তদার মোঃ রাসেল আহমেদ ও সিরাজ সরকার জানান, ভরা মৌসুমে যে পরিমাণ মাছ আড়তে আসার কথা ছিল, তার সামান্য অংশই পাচ্ছেন তারা। সরবরাহ সংকটের কারণেই চাতালগুলো কাঁচামাল পাচ্ছে না।
চলনবিলের এহেন দুরবস্থার পরিবেশগত কারণ তুলে ধরে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বাঁধ নির্মাণ, কৃষি জমি রূপান্তর ও শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণের কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা না গেলে মিঠাপানির প্রাকৃতিক মাছ চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।"
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, চলনবিলে মাছের সংকটের কারণে শুঁটকি উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং নিরাপদ উপায়ে স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরি নিশ্চিত করতে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ চাতাল মালিক ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ অব্যাহত রেখেছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...