বিজ্ঞাপন
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বাধীন সূত্রধর পেশায় কাঠমিস্ত্রি। অন্যের বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দিনশেষে যে চার-পাঁচশ টাকা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চলে পাঁচ সদস্যের আহার। তবে সংসারের এই চরম দারিদ্র্যকেও ছাপিয়ে গেছে তাঁর তিন সন্তানের ভাগ্যবিড়ম্বনা।
বড় ছেলে সনজীব সূত্রধর (১৮), মেঝো মেয়ে সৃষ্টি সূত্রধর (১৫) ও ছোট সন্তান সমাপ্ত সূত্রধর (১২) তিনজনই জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী।
একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে প্রতিদিনের চাল-ডালের সংস্থান, অন্যদিকে চলৎশক্তিহীন তিন সন্তানের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও নিয়মিত পথ্য সব মিলিয়ে দিশেহারা স্বাধীন সূত্রধর ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী সূত্রধর। বয়সের ভারে সন্তানরা বেড়ে উঠলেও বাড়েনি তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার সক্ষমতা। ফলে এই দম্পতির কাছে প্রতিটি নতুন দিন আসে এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে।
সন্তানদের গোসল করানো, মুখে তুলে খাওয়ানো থেকে শুরু করে মলমূত্র পরিষ্কার—সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে হয় মা শ্রীমতী সূত্রধরকে। বিছানায় পড়ে থাকা তিন বড় সন্তানকে একা রেখে বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করে পরিবারে বাড়তি আয়ের জোগান দেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
শ্রীমতী সূত্রধর অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, সারাদিন ওদের পেছনেই কেটে যায়। নিজের দিকে তাকানোর ফুরসত নেই। আমরা বেঁচে থাকতে না-হয় টেনেটুনে দেখছি, কিন্তু আমাদের অবর্তমানে ওদের কে দেখবে? এই চিন্তায় রাতে চোখের পাতা এক করতে পারি না।
নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বাধীন সূত্রধর। তিনি বলেন, বড় ছেলেটা সুস্থ থাকলে এই বয়সে হয়তো সংসারের হাল ধরত, আমার বোঝা কিছুটা কমত। কিন্তু কপাল এমন, তিনজনকেই কোলে-পিঠে করে টানতে হচ্ছে। প্রতিদিন কাজ জুটলে খাবার জোটে, না জুটলে অর্ধাহারে থাকতে হয়। এর ওপর ওদের ওষুধ বা বাড়তি খাবার কেনার সামর্থ্য আমার একার আয়ে নেই।
পরিবারটির দীর্ঘদিনের আবেদনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সুনীল চন্দ্র দাসের উদ্যোগে বড় ছেলে সনজীব ও ছোট মেয়ে সমাপ্ত সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে রহস্যজনকভাবে আজও ভাতার সুবিধা থেকে বঞ্চিত ১৫ বছর বয়সী মেঝো মেয়ে সৃষ্টি সূত্রধর। তিনটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের পরিবারে একজনের ভাতা আটকে থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ইউপি সদস্য সুনীল চন্দ্র দাস জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজ উদ্যোগে দুজনকে ভাতার আওতায় এনেছেন এবং সৃষ্টির ভাতার জন্যও সমাজসেবা অফিসে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
পরিবারটির এই মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রিয়াস চন্দ্র দাস জানান, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি এ ধরনের বিশেষ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হলেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিবারটিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার পথ খোঁজা হবে।
এদিকে পুরো বিষয়টি অবগত হয়ে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ। তিনি বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ওই পরিবারের তিন সন্তানের চলাচলের সুবিধার্থে দ্রুত তিনটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে বঞ্চিত সৃষ্টি সূত্রধরের প্রতিবন্ধী ভাতা যেন দ্রুত চালু হয়, সে ব্যাপারে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছি।”
হাওরের প্রতিকূল পরিবেশে এই হতদরিদ্র দম্পতির বুকভাঙা আকুতি—কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর সরকারি পুনর্বাসন ও সমাজের বিত্তবানদের একটুখানি সহানুভূতিই পারে তাঁদের এই অন্তহীন অন্ধকারের মাঝে কিছুটা স্বস্তির আলো জ্বালাতে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...