বিজ্ঞাপন
তবে আধুনিক সময়ে এসে স্বেচ্ছাসেবার এই চিরায়ত দর্শনে এক ধরনের কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত সংখ্যার প্রতিযোগিতা বা 'কোয়ান্টিটি'র মোহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই একসাথে একাধিক সংগঠনের পরিচয়পত্র বা পদবি ধারণ করাকে সাফল্যের মাপকাঠি মনে করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্বেচ্ছাসেবী কাজে যেখানে কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক নেই, সেখানে কেন আমরা নিজেদের এভাবে একাধিক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে ফেলছি?
উত্তরটা খুব সরল হলেও এর গভীরতা অনেক। স্বেচ্ছাশ্রমে আর্থিক লাভ না থাকলেও, এখানে আমাদের জীবন থেকে দেওয়া সময় এবং মেধার একটি বড় মূল্য রয়েছে। আর ঠিক এখানেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। যখন একজন ব্যক্তি নিজের সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা না করে একসাথে চার-পাঁচটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো জায়গাতেই তিনি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। দিনশেষে মানুষের শক্তি ও সময়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ফলে এক সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে অন্য সংগঠনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায়, একটি বা দুটি সংগঠনে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করাই সময়ের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট। যখন কেউ অল্প জায়গায় নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন, তখন সেখানে তার কাজের মান বা 'কোয়ালিটি' বজায় থাকে। বিপরীতে, বহুমাত্রিক সংগঠনের চাপে পড়ে কিছুদিন পর পর সংগঠন পরিবর্তন করার একটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়। এই ঘন ঘন দলবদল বা দায়িত্ব অবহেলা—কোনোটিই ব্যক্তির নিজের দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা সংশ্লিষ্ট সংগঠন, কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। এতে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড যেমন ভেঙে পড়ে, ঠিক তেমনি ব্যক্তি নিজেও বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা হারান।
তাই বর্তমান ও হবু সকল স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি বিনীত আহ্বান, আপনারা যা-ই করবেন, একটু ভেবেচিন্তে এবং নিজের সামর্থ্য বিচার করে সিদ্ধান্ত নিন। যেকোনো একটি বা দুটি জায়গায় মন দিয়ে কাজ করে নিজের সেরাটা দিন। মনে রাখা প্রয়োজন, দশটি সংগঠনে নামমাত্র সদস্য থাকার চেয়ে একটি সংগঠনে সক্রিয় ও কার্যকারী ভূমিকা রাখা অনেক বেশি সম্মানের এবং অর্থবহ।
পাশাপাশি আমাদের পেশাদারিত্বের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। যদি সত্যিই পড়াশোনা, চাকরি, পারিবারিক বা অন্য কোনো বাস্তব সংকটের কারণে সময় দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে সংগঠনের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী আগে থেকেই কর্তৃপক্ষকে লিখিত বা মৌখিকভাবে অবহিত করা উচিত। এটি কেবল একটি নিয়ম নয়, বরং এটি একজন সচেতন মানুষের দায়িত্বশীলতা ও ম্যাচিউরিটির পরিচয় বহন করে। হুট করে গায়েব হয়ে যাওয়া বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা কোনো সুস্থ স্বেচ্ছাসেবী সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
পরিশেষে বলতে চাই, এই আলোচনা বা আত্মোপলব্ধি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আঘাত করার জন্য কিংবা কারও মন ভাঙার জন্য নয়। এটি মূলত আমাদের চারপাশের বর্তমান স্বেচ্ছাসেবী সংস্কৃতির গুণগত মানকে আরও উন্নত করার একটি বিনীত প্রচেষ্টা মাত্র। আসুন, আমরা সিভির পাতা ভারী করার জন্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রচারের সস্তা সংখ্যার পেছনে না ছুটি। বরং কাজের মান, গভীরতা ও সততা দিয়ে সমাজ পরিবর্তনে সত্যিকারের এবং টেকসই ভূমিকা রাখি। তবেই স্বেচ্ছাসেবার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...