Logo Logo

উড়াল গ্যাসের গ্রাম: প্রয়োজনের আগুন, নাকি বিপদের পূর্বাভাস?


Splash Image

ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাকাইল গ্রামে জ্বলে ওঠে চুলার আগুন। ধোঁয়ার রেখা উঠতে থাকে আকাশে, কিন্তু সেই আগুনের উৎস যেন অদৃশ্য। গাছের ডাল বেয়ে, বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশ ঘেঁষে ছুটে চলা পাইপলাইনের ভেতর দিয়ে পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। এখানেই জন্ম নিয়েছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা “উড়াল গ্যাস”।


বিজ্ঞাপন


তিতাস নদীর পাড়ঘেঁষা এই গ্রামে বছরের পর বছর পানির নিচ থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠে এসেছে। স্থানীয়রা সেই গ্যাস সংগ্রহ করে ড্রামে জমা রাখে, তারপর প্লাস্টিক পাইপে ভরে ছড়িয়ে দেয় পুরো গ্রামে। রান্না, ছোট কারখানা, সবখানেই এর ব্যবহার।

বিজিএফসিএল সূত্র মতে, ২০০৭ সালে তিতাস গ্যাস ফিল্ড-এর ৩ নম্বর কূপে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকেই মাটির নিচ থেকে গ্যাস নির্গমন শুরু হয়। কূপটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও গ্যাস লিকেজ বন্ধ হয়নি বরং সময়ের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে।

গ্রামের ভেতরে হাঁটলেই চোখে পড়ে গাছের ডালে জড়ানো পাইপ, রাস্তার দুই পাশে ঝুলন্ত লাইন, কোথাও আবার বিদ্যুতের তারের গা ঘেঁষে গ্যাস চলাচল। কোনো পরিকল্পিত অবকাঠামো নয়, বরং টিকে থাকার এক স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবন।

তবে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রভাবশালী একটি চক্র। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী (আওয়ামী লীগের কাশেম, বিল্লাল, সিরাজুল ইসলাম, বশির উদ্দিন এবং তাদের লিডার বিএনপি ইউনিয়ন সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মাঈনুদ্দিন ও নিয়ামত খা) গোষ্ঠীর মাধ্যমে মাসিক অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে সংযোগ। গ্রামের কয়েক হাজার রান্নার চুলা বা ৩৫টি চুন-চুড়ি কারখানার জন্য গুনতে হয় উল্লেখযোগ্য টাকা।

ক্যামেরায় কথা বলতে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এলাকায় চুনের গন্ধের কারনে বিভিন্ন গাছ বিশেষ করে ফলের গাছ নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের শরীরিক রোগের বাসা বাধে। প্রশাসন মাঝে মাঝে এসে পাইপ কেটে দেয়, কিন্তু কয়েকদিন পরই আবার সংযোগ হয়ে যায়। এগুলো অনেকটা লোক দেখানো অভিযান। ম্যানেজ করেই চলে।

স্থানীয় ভোক্তাদের ভাষায়, ১৫ বছর ধরে চালাচ্ছি। ভয় তো লাগে, কিন্তু বিকল্প নাই। আগে চাপ বেশি ছিল, এখন কম। সরকার ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হয়।

এই স্বীকারোক্তিতেই স্পষ্ট ঝুঁকি জেনেও মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এই গ্যাসের ওপর। কারণ, বৈধ সংযোগ নেই, বিকল্পও সীমিত।

কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা ভয়াবহ। গ্যাসের চাপ অনিয়মিত, পাইপগুলো অরক্ষিত, আর ঠিক পাশেই বিদ্যুতের লাইন একটি ছোট স্পার্কই যথেষ্ট বড় দুর্ঘটনার জন্য। সচেতন মহলের মতে, এটি “পকেট গ্যাস” যা অস্থির, অনিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক।

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক মোঃ শামীম আহমেদ বলেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, মানুষ ঝুঁকি জেনেও ব্যবহার করছে। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ কামরুল হাসান বলেন, বাকাইলে যে উড়ন্ত গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে তা আমাদের জন্য উদ্বেগের। অনেক বছর ধরে এভাবে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। প্রশাসন অভিযান চালায়, বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু আবার সংযোগ হয়ে যায়। প্রশ্ন থেকে যায়!! কেন এই অভিযান টেকসই হচ্ছে না?

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, বাকাইল গ্রামের ‘উড়াল গ্যাস’ ব্যবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নিয়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। “আজ না কাল” আশ্বাসের ভেতরেই থেমে আছে জবাব।

যে তিতাস গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতিদিন বিপুল গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎসের পাশেই বসবাস করা মানুষ আজও বৈধ সংযোগ থেকে বঞ্চিত। এই বৈপরীত্যই যেন জন্ম দিয়েছে “উড়াল গ্যাস” বাস্তবতার।

বাকাইল গ্রামের আকাশে ঝুলে থাকা পাইপগুলো শুধু গ্যাস নয়, বহন করছে মানুষের প্রয়োজন, প্রভাবশালী বাণিজ্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা আর অজানা আতঙ্ক। “উড়াল গ্যাস” এখানে একদিকে বেঁচে থাকার উপায়, অন্যদিকে যেকোনো সময় নেমে আসা বিপর্যয়ের সংকেত।

এখন প্রশ্ন? সমাধান কি সত্যিই আসবে, নাকি “আজ না কাল” বলেই ঝুলে থাকবে এই গ্যাস সংযোগ বাস্তবতা?

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...