বিজ্ঞাপন
বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রতিদিনের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার দায়িত্বে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং অংশ নেওয়া দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র’ (আইপিসিসি)। সম্প্রতি এই যৌথ তদন্ত দলের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল গোপন নথির অংশ বিশেষ প্রকাশ করেছে স্পেনের প্রেনসা ইবেরিকার অনুসন্ধানী অপরাধবিষয়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সেখান থেকেই উঠে এসেছে টুর্নামেন্টজুড়ে কীভাবে বিশ্বের শীর্ষ সারির তারকা ফুটবলার, রেফারি ও কোচরা প্রাণনাশের সরাসরি হুমকি, বোমাতঙ্ক ও উগ্র সমর্থকদের নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েছিলেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের উপাত্ত অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই এবং পুরো বিশ্বকাপজুড়ে সবচেয়ে মারাত্মক ও বেশি প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নজিরটি ঘটে আর্জেন্টিনা ও জর্ডানের মধ্যকার ম্যাচ চলাকালীন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে দাবি করেন, তিনি ও তার দুই সহযোগী এআর-১৫ সেমিঅটোমেটিক রাইফেল এবং ঘরে তৈরি শক্তিশালী বোমা নিয়ে স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সশস্ত্র দলটির প্রধান লক্ষ্য ছিলেন মেসি এবং তারা দুই দলের খেলোয়াড় ও পুলিশের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তবে এটিই একমাত্র ঘটনা নয়; মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগেও ছড়িয়ে পড়েছিল তীব্র বোমাতঙ্ক। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক ব্যবহারকারী খোলাখুলি পোস্ট করে হুমকি দেন যে, আটলান্টা স্টেডিয়ামে শরীরে চারটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বোমা বেঁধে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মেসিকে উড়িয়ে দেবেন তিনি। ম্যাচ চলাকালেও স্থানীয় পুলিশ সদর দপ্তরে একাধিকবার নামপরিচয়হীন ফোন আসে, যেখানে দাবি করা হয় স্টেডিয়ামের বিভিন্ন ডাস্টবিনে অন্তত তিনটি বিস্ফোরক রাখা আছে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পুরো মাঠে নজিরবিহীন চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
আর্জেন্টাইন মহাতারকার পাশাপাশি পর্তুগালের সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরেও নিরাপত্তা আধিকারিকদের পোহাতে হয়েছে মারাত্মক ঝক্কি। গত ১৪ জুন ফিফার এক কর্মকর্তা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি হোটেলে রোনালদোর অবস্থান ও কক্ষ সংক্রান্ত গোপনীয় তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। দুই দিন পর ১৬ জুন হিউস্টনে পর্তুগাল দলের অবস্থানরত হোটেল এলাকা থেকে ওই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু তা-ই নয়, টরন্টোতে হোটেলে রোনালদোর নিরাপত্তা বেষ্টনী টপকে লিফটে ঢোকার চেষ্টা করা এক অনুরাগী আটক হন, যিনি পরবর্তীতে দাবি করেন সিআর-সেভেনের সঙ্গে শুধু একটি সেলফি তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। এমনকি মিয়ামিতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ চলাকালীন এক সমর্থক হুট করেই নিরাপত্তা টিমের চোখ ফাঁকি দিয়ে সোজা মাঠে নেমে রোনালদোর দিকে ছুটে যান।
মাঠের খেলা বা একক কোনো ভুলের মাশুল গুণতেও খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হতে হয়েছে শিহরণ জাগানো হুমকির। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার পর রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত রূপ নেয়। এমনকি প্যারাগুয়ের রাজনীতিবিদরাও তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন এবং পরবর্তীতে দেশটির রাস্তায় এমবাপ্পের কুশপুত্তলিকা দাহ করার ভিডিও নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সহজ গোলের সুযোগ মিস করায় আতলেতিকো মাদ্রিদের নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ ও তার স্ত্রীকে ফোনে সরাসরি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। একই পরিণতি ঘটে কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজের ক্ষেত্রেও; পেনাল্টি মিসের পর প্রাণভয়ে তিনি টুর্নামেন্ট শেষে সতীর্থদের সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে পর্যন্ত সাহস পাননি। স্পেনের বিপক্ষে ফাউল করা ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে এবং প্রথম রাউন্ড থেকে ছিটকে যাওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া দলের কোচ হং মাইওং-বো ও পুরো দলকেও বিমানবন্দরে কড়া পুলিশি পাহারায় পৌঁছে দিতে হয়েছিল।
তবে সব ধরনের হুমকি ও মানসিক নিগ্রহের পরিসংখ্যানে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার। আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার বিতর্কিত ম্যাচের পর ক্ষুব্ধ মিসরীয় সমর্থকদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো হয়েছিল প্রায় ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক বার্তা! শুধু লেতেক্সিয়ার নন, ওই ম্যাচে ভিএআরের (VAR) দায়িত্বে থাকা আরেক ফরাসি রেফারি উইলি দেলাজোদকেও প্রাণনাশের হুমকি পেতে হয়। এই দুই ম্যাচ অফিসিয়ালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরবর্তীতে ফ্রান্সে তাদের নিজ বাসস্থান ও স্বজনদের বাড়িতে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা বসাতে বাধ্য হয় ইউরোপীয় প্রশাসন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...