Logo Logo

রাজাপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ, স্থানীয়দের ক্ষোভ


Splash Image

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা থাকলেও স্থানীয় ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, যুবদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও তাদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হতে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ফ্যামিলি কার্ড শুমারির কাজে নিয়োগ দিয়েছেন।

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই ‘রাজাপুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেলের স্বাক্ষরে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে পাঁচ শতাধিক প্রার্থী আবেদন করেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহারিক দক্ষতা, মৌখিক পরীক্ষা ও জিপিএ নম্বরের ভিত্তিতে ফল নির্ধারণের কথা ছিল।

গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি ইউএনও রিফাত আরা মৌরি ও সদস্য সচিব মো. মোজাম্মেলের স্বাক্ষরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৯০ জন তথ্য সংগ্রহকারীর মধ্যে ৫১ জন প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত, পাঁচজন রিজার্ভ এবং ৩৪ জন অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন। এছাড়া ১০ জন সুপারভাইজারের মধ্যে পাঁচজন প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত, একজন রিজার্ভ এবং চারজনকে অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহারিক পরীক্ষা, জিপিএ, আচরণ ও ভাইভায় উত্তীর্ণদের মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করার নিয়ম থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, তাদের সন্তান ও ঘনিষ্ঠজনদের একটি বড় অংশকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের হস্তক্ষেপে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সুপারভাইজার পদে কারা থাকবেন, তা উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের নেতারা আগেই নির্ধারণ করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া শুক্তাগড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা শারমিন আক্তারের আবেদনে একই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. রেজওয়ান হোসেন সিল ও স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ করেন বলে জানা গেছে। গালুয়া ইউনিয়নের বিএনপি সভাপতি মুহাম্মদ মাহফুজ আহম্মেদের আবেদনেও সিল-স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ করেন। এসব ঘটনায় অর্থের বিনিময়ে সুপারিশের মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয়রা।

রাজাপুর সদর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী ও এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে চশমা সুমনকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, তিনি কোনো চাকরি না করলেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। তার স্ত্রী আগে বাগেরহাটে ব্র্যাকে চাকরি করতেন। রফিকুল ইসলাম জামাল নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক পাওয়ার পর তিনি চাকরি ছেড়ে রাজাপুরে চলে আসেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। বর্তমানে পরিবার নিয়ে রাজাপুরে ভাড়া বাসায় বসবাস ও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি তিনি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। এ অবস্থায় তার আয়ের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে সদর ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সাকিব আল হাসান শান্ত ও ছাত্রলীগের সভাপতি পদপ্রার্থী মো. তরিকুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ছাত্রদলের ওয়ার্ড সভাপতি পদপ্রার্থী মো. আব্দুল হাই শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত সনদ না দিয়েও আবেদন করে নির্বাচিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুক্তাগড় ইউনিয়নে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসিম উদ্দিন আকনের ভাতিজা মো. হিমেল আকন নির্বাচিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গালুয়া ইউনিয়নে বিএনপি সভাপতির সিল-স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশে মুহাম্মদ মাহফুজ আহম্মেদকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের কর্মী মো. দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে সাদিয়া বিনতে হোসাইন তিথিও নিয়োগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বিএনপির একাংশের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একটি পক্ষ উপজেলা প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে অযোগ্যদের নিয়োগ দিয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, অনেক যোগ্য, শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ প্রার্থী আবেদন করেও সুযোগ পাননি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে সংকটে পড়তে হবে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজাপুর সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে চশমা সুমন। তিনি বলেন, “আমি শুমারিতে মেধার ভিত্তিতে যোগ্য হয়েই নির্বাচিত হয়েছি। এখানে কোনো দলীয় বিবেচনা ছিল না। অধিকাংশ প্রার্থীর যোগ্যতা না থাকায় তারা বাদ পড়েছেন। এ কারণে প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছেন।”

দলীয় সুপারিশের অভিযোগ অস্বীকার করে রাজাপুর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ পারভেজ বলেন, ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে তার কোনো আত্মীয়স্বজন সুযোগ পাননি। প্রশাসন শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে এবং তাদের কোনো সুপারিশ কাজ করেনি।

এদিকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাধারণ আবেদনকারীদের অভিযোগ, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে আবেদন ফি, সময় ও শ্রম নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দলীয়করণ করা হয়েছে। এ নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের সমালোচনা করে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল বলেন, ভাইভা বোর্ডের মাধ্যমে শতভাগ মেধার ভিত্তিতে ফলাফল তৈরি করে যোগ্যদের বেছে নেওয়া হয়েছে। কাউকে সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। গালুয়া ইউনিয়নের একজন প্রার্থীর আবেদনে বিএনপি সভাপতির সিল-স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি ভাইভায় উত্তীর্ণ হওয়ায় তাকে নেওয়া হয়েছে। নিয়ম না মেনে আবেদন করা ব্যক্তিকে কেন বাদ দেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়ম না মানলে বাদ দিতে হবে—এমন কোনো নির্দেশনা বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরির বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে দিলে বিষয়টি দেখা হবে।”

এ বিষয়ে ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, “এই নিয়োগ ৪৫ দিনের জন্য। তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করবেন। নিয়োগ বোর্ড সবার যোগ্যতা যাচাই করেছে। আমি এ নিয়োগের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। একটি মহল ফ্যামিলি কার্ডকে বিতর্কিত করার জন্য এই নিয়োগে ঢুকতে চেয়েছিল। তারা পারেনি, তাই এখন মিথ্যা রটাচ্ছে।”

রাজাপুরে ছাত্রলীগের এক নেতা নিয়োগ পেয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এমপি বলেন, “সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তবে কোনো অপরাধে জড়িত ব্যক্তি নিয়োগ পেয়ে থাকলে তার দায় নিয়োগ বোর্ডের।”

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...