বিজ্ঞাপন
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ সময় ২০ থেকে ৩০টি বাড়িঘর ও চারটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে তাহিরপুর উপজেলা সদরের মধ্য তাহিরপুর গ্রামের তাহিরপুর-জামালগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের সড়কে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র, ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা ব্যবহার করে বলে স্থানীয়রা জানান। পরে আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে পুনরায় সংঘর্ষের আশঙ্কায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে বীরজয় লক্ষ্মী ধুতমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গ্রামের কয়েকজন তরুণ ক্রিকেট খেলছিলেন। খেলার সময় একটি ক্রিকেট বল পাশের সড়ক দিয়ে যাওয়া মধ্য তাহিরপুর গ্রামের জালাল মিয়ার ইজিবাইকের ওপর গিয়ে পড়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হাফিজ মিয়ার সঙ্গে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের কথা-কাটাকাটি ও একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে ওই দিন বিকেলে তাহিরপুর বাজারে ধুতমা গ্রামের জসিম উদ্দিনকে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কয়েকজন মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর মঙ্গলবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাফিজ মিয়াকে বীরনগর গ্রামের কয়েকজন মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরপর এসব মারধরের ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে বীরনগর গ্রামের একটি মসজিদের মাইকে বুধবার সকালে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান। ওই ঘোষণায় বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজনকে যার কাছে যে অস্ত্র রয়েছে, তা নিয়ে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাইকে ঘোষণার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেন। তবে রাতেও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
বুধবার দুপুরে বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মধ্য তাহিরপুর এলাকায় জড়ো হন বলে স্থানীয়রা জানান। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, চার গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ নৌকাযোগে এসে তাদের এলাকায় হামলা চালান। এ সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। নারীদের মারধরেরও অভিযোগ করেন তারা। একপর্যায়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের আলকাছ মিয়ার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের লোকজনও প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাল্টা আক্রমণ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আহতদের অনেকে স্থানীয় বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা তানিম আহমদ লিংকন ও রহিমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাতে বীরনগর গ্রামের মসজিদের মাইকে বুধবার সকালে আমাদের গ্রামে হামলার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর বুধবার দুপুরে হঠাৎ চার গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ নৌকা নিয়ে এসে আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। নারীদেরও মারধর করা হয়েছে। একপর্যায়ে একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।’
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বীরনগর গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া বলেন, শিশুদের ক্রিকেট খেলার সময় ইজিবাইকে বল পড়াকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা মারধরের ঘটনা ঘটে। বুধবারও দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। পরে স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, ‘তুচ্ছ একটি ঘটনা থেকে মারামারি এবং পরে আজকের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আমি বর্তমানে ঢাকায় আছি। আজকের ঘটনায় আমরা লজ্জিত। উভয় পক্ষের কিছু অতিউৎসাহী মানুষের কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। তবে এলাকার মানুষ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।’
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ বলেন, কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ‘মসজিদের মাইকে সংঘর্ষের ঘোষণা দেওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়। দুই পক্ষের লোকজনকে সংঘর্ষে না জড়ানোর জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বুধবার দুই পক্ষের লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়ার পর একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।’
ওসি আরও জানান, সংঘর্ষে ইটপাটকেলের আঘাতে ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা বা কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...