বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এছাড়া ভারত ও চীন থেকে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। তবে এই দুই দেশের অনেক রিফাইনারিই ইরান থেকে স্বল্পমূল্যে তেল সংগ্রহ করে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ চেইনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। সে হিসেবে মাসিক চাহিদা ৩ লাখ ৬০ হাজার টন এবং দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন।
চলতি মার্চ মাসে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫০ টনে। গত ২১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৯ টন। দৈনিক ১২ হাজার ৭৭৭ টন সরবরাহের ভিত্তিতে এই মজুতে আর মাত্র ১২ দিন চলা সম্ভব।
অকটেনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সংকটজনক। দেশে অকটেনের মজুত সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৩৬১ টন হলেও বর্তমানে মজুত নেমে এসেছে ৯ হাজার ৮২৯ টনে। মার্চ মাসে গড় চাহিদা ছিল ৩৬ হাজার ৭০০ টন। দৈনিক ১ হাজার ১৯৩ টন সরবরাহ বিবেচনায় এই মজুতে মাত্র ৮ দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে।
পেট্রোলের অবস্থাও একই রকম চাপের মধ্যে রয়েছে। মোট মজুত সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন হলেও বর্তমানে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ২২৫ টন। মার্চে গড় চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১০০ টনে। দৈনিক ১ হাজার ৪৯৬ টন সরবরাহের হিসেবে এই মজুত সর্বোচ্চ ১১ দিন চলবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের মজুত বর্তমানে ৪৪ হাজার ৪১৪ টন, যা দৈনিক ২ হাজার ৪১৯ টন ব্যবহারের ভিত্তিতে ১৮ দিনের চাহিদা মেটাতে পারবে। অন্যদিকে, জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৩৬ হাজার ৬৬১ টন, যা দৈনিক ১ হাজার ৫৪৭ টন ব্যবহারের হিসেবে ২৪ দিনের জন্য যথেষ্ট।
দেশে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনের একটি বড় উৎস কনডেনসেট, যা প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। গত অর্থবছরে পেট্রোবাংলা প্রায় ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৩৭২ টন কনডেনসেট সংগ্রহ ও পরিশোধন করেছে। তবে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় কনডেনসেট উৎপাদনও কমে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলের মোট চাহিদা ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন, যা পুরোপুরি দেশীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে। তবে অকটেনের ক্ষেত্রে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট না হওয়ায় বিপিসিকে বিদেশ থেকে ৯৫ রন মানের ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩ টন অকটেন আমদানি করতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। বর্তমানে ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যা এক বছর আগে ছিল ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র তিতাসেও উৎপাদন কমেছে—২৬টি কূপ থেকে বর্তমানে ৩১৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা গত বছর ছিল ৩৭৮ মিলিয়ন ঘনফুট।
এদিকে, পেট্রোল ও অকটেন সংকটের পেছনে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগও উঠেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, “অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদনের উৎস মূলত রিফাইনারি ও কনডেনসেট। এখন খতিয়ে দেখা দরকার কোথা থেকে কতটুকু তেল পাওয়া যাচ্ছে। অতীতে এমন ঘাটতি দেখা যায়নি। তাহলে এখন কেন হচ্ছে—তা তদন্ত জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান কনডেনসেট আমদানি করে থাকে। তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ বা মজুতদারির মাধ্যমে পরিস্থিতি জটিল করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মজুতে কিছুটা চাপ পড়েছে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তিনি সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম অভিযোগ করেছেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছে না। তার দাবি, পেট্রোল ও অকটেন দেশেই উৎপাদিত হওয়ায় কৃত্রিম সংকটের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তিনি বলেন, “আগামী মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে—এই আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে কিছু বেসরকারি সিআরইউ (কনডেনসেট রিফাইনারি ইউনিট) বিপিসিকে সরবরাহ দিচ্ছে না। এতে সংকট আরও বাড়ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা—উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশ এখন জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...