বিজ্ঞাপন
গত ১৬ মে রোববার গভীর রাতে সেতুর পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে যায়। পরদিন সোমবার সকালে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাটি দেখতে পেয়ে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই দুর্ঘটনার ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বহু প্রতীক্ষিত সেতুটির ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে দাবি করে যে, প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসের কারণেই গার্ডারগুলো ভেঙে পড়েছে। তবে এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই ব্যাখ্যা কোনোভাবেই মানতে নারাজ। তাদের দাবি, রোববার রাতে এমন কোনো ভয়াবহ ঝড় হয়নি, যার আঘাতে একটি শক্তিশালী পিসি গার্ডার সেতুর পাঁচটি অংশ একসঙ্গে ভেঙে নদীতে পড়ে যেতে পারে।
নদীতীরবর্তী গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা ও টং দোকানদার মো. আলাউদ্দিন বলেন, রাতে কোনো বড় ধরনের ঝড় হয়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি গার্ডার নদীতে পড়ে আছে। যদি এত বড় ঝড় হতো, তাহলে আমার দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এত শক্ত গার্ডার কীভাবে সাধারণ বাতাসে পড়ে যায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের সাবেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের কাজের মান ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কাজ ঝুলিয়ে রেখে নানা অনিয়ম ও অবহেলার কারণে আজ এই বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নিজাম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, সেতুর আগের ঠিকাদার তমা কনস্ট্রাকশনের লোকজন গার্ডারের সঙ্গে থাকা কিছু রড খুলে নিয়ে গেছে বলেই এগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং এর ফলেই গার্ডারগুলো নদীতে ভেঙে পড়েছে। একটি সেতুর জন্য আমরা দীর্ঘ আট বছর ধরে অপেক্ষা করছি, কিন্তু কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তিনি আরও বলেন, এই সেতু চালু হলে তাহিরপুর ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসত; ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতো। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষ এখন পুরোপুরি হতাশ।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে যাদুকাটা নদীর ওপর ৭৫০ মিটার দীর্ঘ এই পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন প্রকল্পটির দায়িত্ব পায়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়ানো হলেও প্রকল্পটি শেষ করতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদার সরে গেলে এলজিইডি তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। এর আগেও ২০২২ সালে বন্যার সময় একই সেতুর দুটি গার্ডার নদীতে ভেঙে পড়েছিল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় সেতুর নির্মাণমান ও প্রকৌশলগত ত্রুটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বাদাঘাট এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা আবুল হোসেন বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ বছরের পর বছর ঝুলে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। গার্ডার নদীতে পড়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে এলজিইডির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। শুধুমাত্র বাতাসের কারণে এত বড় গার্ডার ধসে যাওয়ার বিষয়টি আমরাও বিশ্বাস করছি না; এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি আরও জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের ব্যর্থতার কারণেই সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। বারবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। বর্তমানে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে বাকি কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে তমা কনস্ট্রাকশনের যাদুকাটা সেতু প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার প্রকৌশলী নবীন উল বিন জাহিদ দাবি করেন, সেতুর প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ আমরা সম্পন্ন করেছিলাম। যাদুকাটা নদীতে পানির স্রোত অনেক বেশি হওয়ায় সব সময় কাজ করা সম্ভব হয়নি। গার্ডারের উচ্চতা অনেক বেশি এবং এগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি রড দিয়ে সংযুক্ত ছিল। প্রবল বাতাসে একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লাগায় ধাপে ধাপে পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে গেছে।
তবে স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন, যদি একটি সেতুর গার্ডার শুধুমাত্র সামান্য বাতাসেই ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই সেতুর সামগ্রিক নির্মাণমান কতটা নিরাপদ ছিল? দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প এখন শুধু একটি সেতুর নির্মাণকাজ নয়, বরং তাহিরপুরবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, ক্ষোভ ও গভীর হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...