Logo Logo

৭ বছর ধরে বেতন-ভাতা পান না শিক্ষক-কর্মচারীরা

অস্তিত্ব সংকটে গোবিপ্রবি স্কুল অ্যান্ড কলেজ


Splash Image

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সন্তানদের ক্যাম্পাসের মধ্যেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীরা ২০১৯ সালের পর থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ সংকট, নিরাপদ খাবার পানির অভাব, স্যানিটেশন, পরিবহন ও খেলার মাঠের মতো নানা সমস্যায় শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।


বিজ্ঞাপন


বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির পাশে মনোরম পরিবেশে ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। তখন নাম দেওয়া হয় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শুরুতে ১৬ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্রথম বছর ৬৭৫ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তবে কলেজ শাখা চালু করা হয়নি।

২০১৯ সালের পর শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে বিদ্যালয়টি পাঠদানের অনুমোদন পায়। পরে বিদ্যালয়টি লাইব্রেরির পাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের পাশে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই বিদ্যালয়টির সৌন্দর্য ও পরিবেশ নষ্ট হতে থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বর্তমানে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে মাত্র ১৬০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শ্রেণিকক্ষের সংকট এতটাই প্রকট যে, একই কক্ষে একসঙ্গে দুটি শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত ফ্যান নেই, নিরাপদ খাবার পানির সংকট রয়েছে এবং ওয়াশরুমের পাশের ঝোপ-জঙ্গলে সাপের উপদ্রবের অভিযোগও রয়েছে। বৃষ্টির সময় টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া খানম বলে, ‘আমি এখানে প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছি। আমাদের বিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো ভালো নয়। ওয়াশরুম ও নিরাপদ খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। ভিসি স্যার আমাদের এ সমস্যা সমাধান করবেন বলে আমি প্রত্যাশা করছি।’

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফরিদুজ্জামান আহসাফ বলে, ‘ওয়াশরুমের পাশে ঝোপ-জঙ্গল। সেখানে সাপ থাকে। ভয় লাগে। এছাড়া বৃষ্টি হলে ক্লাসরুমের চাল দিয়ে পানি পড়ে।’

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়ান বলে, ‘খেলার মাঠ নেই। রোদে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যাই। খুব কষ্ট করে ক্লাস করি। স্কুলে খেলার মাঠ নেই। শ্রেণিকক্ষের অবস্থাও খুব খারাপ। তাই স্কুলের খেলার মাঠ ও নতুন ভবন চাই।’

প্রাক-প্রাথমিকের তাইবুল্লাহ রোহান ও প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুল্লাহর মা তাসলিমা বেগম বলেন, ‘এখানে শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করেন। তারা শিশুদের সুন্দরভাবে টেক কেয়ার করেন। তাদের কারণেই দুই ছেলেকে এখান থেকে নিয়ে অন্য স্কুলে দিইনি। তারা এখানেই পড়ছে।’

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহিমের মা সায়লা জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চমৎকার ও নিরাপদ পরিবেশ শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে। এ কারণে তিনি সন্তানকে এখানে ভর্তি করিয়েছেন। তবে সুযোগ-সুবিধার তুলনায় সমস্যাই বেশি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘একটি কক্ষে একই সঙ্গে দুটি ক্লাস নেওয়া হয়। ক্লাসে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই। আর অন্যান্য সমস্যাতো রয়েছেই।’

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুল ইসলাম নাহিদ বলেন, তিনি এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে বর্তমানে গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগে পড়াশোনা করছেন। তার ভাষ্য, শিক্ষকরা বিদ্যালয়টিকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তারা বেতন-ভাতা না পাওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর সমাধান করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আরেক সাবেক শিক্ষার্থী ঈমান আলী বর্তমানে গোপালগঞ্জ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব ভালো ছিল। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বিদ্যালয়টি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এটি সমাধান করে বিদ্যালয়টিকে মডেল বিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে।’

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাদিম আহমেদ বলেন, ২০১৯ সালে ভিসি চলে যাওয়ার পর থেকে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। স্কুলটি লাইব্রেরির পাশ থেকে সরিয়ে ভিসির বাসভবনের পাশে আনার পর থেকেই সংকট বাড়তে থাকে। বর্তমানে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। ভিসি বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো দূর করলে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থী দুটিই বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটি জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

সহকারী শিক্ষক আফরোজা খানম কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়টির সমস্যা সমাধানের জন্য ভিসির কাছে অনুরোধ জানান।

সহকারী শিক্ষক আলেয়া বেগম বলেন, ‘দীর্ঘ সাত বছর বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা টাকা ও আমাদের পকেটের টাকা দিয়ে স্কুল চালিয়ে যাচ্ছি। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষক খুলনা, কোটালীপাড়া সহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নিয়মিত স্কুল করেন। তাদের কষ্ট আরও বেশি। তাই সদ্য যোগদান করা ভিসি স্যার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন বলে দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. সোহেল হাসান বলেন, বিদ্যালয়টির কোনো অনুমোদন নেই এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামেও নেই। তবে বিদ্যালয়টি চালু রয়েছে এবং সেখানে শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তাই আমি কমিটি করে এটি অর্গানোগ্রামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করব। তারপর ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেব। স্কুলের ব্যাপারে যা যা করার, তা আমি করব। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা প্রসার, মেধা-মনন ও কল্যাণে আমি বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান করব।’

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...