Logo Logo

প্রবাস জীবনের ইতি টেনে গরুর খামারে সফল নাজিম


Splash Image

বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি না খেটে, দেশের মাটিতে সঠিক শ্রম ও মেধা দিলে সহজেই স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। তার এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার আত্মপ্রত্যয়ী যুবক মোঃ নাজিম মুন্সি (৩৮)। ৫ বছরের প্রবাস জীবনের ইতি টেনে নিজ গ্রামে ফিরে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ফাহাদ এম ফার্ম’ নামে একটি আধুনিক গরুর খামার। আর এই খামার দিয়েই তিনি এলাকায় ব্যাপক বাজিমাত করেছেন।


বিজ্ঞাপন


উদ্যোক্তা নাজিম মুন্সি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৭ সালে ভাগ্যান্বেষণে তিনি বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রবাসে থাকাকালীন ইউটিউবে অসংখ্য গরুর খামারের ভিডিও দেখে তিনি দেশে কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, প্রবাসে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কঠোর পরিশ্রম করেন, তার চেয়ে সামান্য কম আয় হলেও দেশে মা-বাবার সাথে থেকে নিজের উদ্যোগে কিছু করবেন। যেই চিন্তা সেই কাজ; ২০২২ সালে প্রবাস জীবন ছেড়ে তিনি পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে আসেন।

২০২৩ সালে মাত্র ৫টি গরু দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণের কাজ শুরু করেন নাজিম। প্রথম বছরই তিনি বেশ ভালো লাভের মুখ দেখেন। সফলতার ধারাবাহিকতায় পরের বছর ১২টি গরু পালন করেন। তারপর থেকে খামারে পশুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। চলতি বছর তিনি খামারে মোট ১৮টি গরু পালন করেন, যার মধ্যে ৩টি গরু ইতিমধ্যেই রমজানের ঈদে বিক্রি করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৫টি গরু আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে। উপযুক্ত দাম পেলে এবার কোরবানির মৌসুমে গরুগুলো বিক্রি করে তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন।

সরেজমিনে ফাহাদ এম ফার্মে গিয়ে দেখা গেছে, নাজিম মুন্সির সংগ্রহে থাকা গরুগুলোর উচ্চতা, আকৃতি ও ওজন বেশ নজরকাড়া। খামারের অধিকাংশ গরুই প্রায় ৭ ফুট লম্বা এবং ৫ ফুট উচ্চতার। কোনোটির ওজন ১৪ থেকে ১৫ মণ, আবার কোনোটি ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত। খামারে রয়েছে শাহীওয়াল, গির ও ব্রাহামা জাতের আকর্ষণীয় সব গরু। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ক্ষতিকর হরমোন বা রাসায়নিক ছাড়াই কাঁচা ঘাস, খড় ও ভুষি খাইয়ে গরুগুলোকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে লালন-পালন করা হচ্ছে। খামারের মালিক নাজিম নিজেই প্রধান কর্মী হিসেবে প্রতিদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।

সফল খামারি নাজিম মুন্সি বলেন, বিদেশে মাসে ১ লাখ টাকা আয়ের চেয়ে দেশে মা-বাবার কাছে থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় করা অনেক বেশি আরাম ও শান্তির। বিদেশের খাটুনির তিন ভাগের দুই ভাগ শ্রম যদি দেশের মাটিতে দেওয়া যায়, তবে দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা পেলে খামারটি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

নাজিমের এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মাঝে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বর্ণি দক্ষিণপাড়া গ্রামের তরুণ জসিম মুন্সি বলেন, নাজিম ভাইয়ের খামারের ভিডিও দেখে আমি উদ্বুদ্ধ হই। পরে সরাসরি খামারে গিয়ে গরুগুলো দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। মোটা-তাজাকরণ যে একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা, তা তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। আমি নিজেও আগামীতে এমন খামার করে স্বাবলম্বী হতে চাই। খামারের কর্মী মোহাম্মদউল্যাহ জানান, তিনি এখানে ১ বছর ধরে কাজ করছেন এবং খামারের আয়ে তার সংসার খুব ভালোভাবে চলছে। তিনি আরও জানান, আগামী কোরবানির আগেই খামারে গরুর সংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে জায়গা কেনা হয়েছে। খামার বড় হলে গ্রামের আরও ৪/৫ জন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্ণি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো: সামাদ মুন্সি বলেন, নাজিমের খামারটি আমার ইউনিয়নের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে যত্ন সহকারে গরু লালন-পালন করে, যার কারণে পশুর স্বাস্থ্য ও আকৃতি বেশ আকর্ষণীয় হয়। আমরা এই খামারটিকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা পর্যায়ে এর নাম সুপারিশ করেছি। টুঙ্গিপাড়ার গণমাধ্যমকর্মী শফিক শিমুল বলেন, শ্রম ও মেধাকে যুগলবন্দী করে নাজিম সমাজে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা দেখে অন্য বেকার যুবকেরা অনুপ্রাণিত হতে পারেন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ বিশ্বাস জানান, আসন্ন কোরবানি উপলক্ষে এবার এ উপজেলায় ১ হাজার ৩৮ জন খামারী ৪ হাজার ২৩৯টি পশু প্রস্তুত করেছেন। যেখানে স্থানীয় চাহিদা রয়েছে ৪ হাজার ১২২টির। ফলে চাহিদার চেয়েও ১১৭টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। আমরা খামারিদের এসব পশু বাজারজাতকরণে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি স্টেরয়েড বা অপদ্রব্যের ক্ষতিকর ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে খামারিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ, ভ্যাক্সিন ও কৃমিনাশক ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে। সরকারিভাবে সরাসরি ঋণ দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও খামারিদের ঋণের প্রয়োজনে সুপারিশ করা হয়ে থাকে।

গোপালগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোবিন্দ চন্দ্র সরদার ফাহাদ এম ফার্ম পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, স্বল্প পুঁজিতে এবং বিদেশের তুলনায় কম পরিশ্রমে গরু মোটা-তাজাকরণ একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। সৌদি আরব থেকে ফিরে নাজিম মুন্সি সেটি বাস্তবে প্রমাণ করেছেন। আমাদের দপ্তর থেকে তাকে একাধিক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খামারটি আরও বড় করার জন্য জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের কারিগরি ও তদারকি সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। নতুন প্রজন্ম যদি তাকে অনুসরণ করে এই লাভজনক পেশায় যুক্ত হয়, তবে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...