বিজ্ঞাপন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য সংকট। তখন দেশের কৃষি উৎপাদন ছিল অত্যন্ত কম, প্রযুক্তি ছিল প্রাচীন এবং কৃষকরা ছিলেন আধুনিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। এই প্রান্তিকালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা উচ্চফলনশীল ফসল, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ এবং মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী গবেষণা শুরু করেন। প্রথমত, ধান ও গমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে তারা এমন কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও জাত উদ্ভাবন করেন যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে সরাসরি ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়ত, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তারা চাষাবাদের পরিধি বহুলাংশে বৃদ্ধি করেন। তৃতীয়ত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে তাদের ধারাবাহিক গবেষণা দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব নিয়ে আসে। চতুর্থত, কৃষিযান্ত্রিকীকরণে নতুন নতুন উদ্ভাবন কৃষকের শ্রম ও সময় দুই-ই সাশ্রয় করেছে। পঞ্চমত, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজ উন্নয়নে তাদের নীতিগত গবেষণা সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। আজ দেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশের কৃষি প্রশাসনের এই মজবুত মেরুদণ্ড তৈরিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য।
বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষির সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা দেশের সামগ্রিক কৃষিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই কঠিন বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রথমত, তারা জলবায়ু সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদী ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন যা প্রতিকূল পরিবেশেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, রাসায়নিক সারের অপব্যবহার কমিয়ে টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনার আধুনিক কৌশল তারা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তৃতীয়ত, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং জৈব কৃষির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে ড্রোন, আইওটি এবং সেন্সরভিত্তিক স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে মাঠপর্যায়ে সফল গবেষণা চালানো হচ্ছে। এছাড়া কৃষি আজ শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সাথেও সম্পর্কিত। বাকৃবির কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ও কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গৌরবময় অবদান কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর স্বীকৃতি দৃশ্যমান। এই প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বিশ্বের নামকরা আন্তর্জাতিক জার্নালে নিয়মিত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন এবং আন্তর্জাতিক কৃষি নীতি নির্ধারণে অংশ নিচ্ছেন। প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা ও ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার বিষয়ে তাদের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের এই মেধার মূল্যায়ন হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তারা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যান।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাধারণত বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রশাসন কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের যেভাবে দৃশ্যমান মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়, কৃষি গবেষকদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না এবং তারা তুলনামূলকভাবে অনেক কম স্বীকৃতি পান। যদিও কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি, তবুও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অন্য অনেক খাতের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। প্রথমত, তাদের জন্য গবেষণা অনুদানের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত, আধুনিক গবেষণাগার ও উন্নত যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিধি ও সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রগুলো বেশ সীমিত। চতুর্থত, মানসম্মত গবেষণা প্রকাশনার জন্য যে ধরনের প্রণোদনা থাকা প্রয়োজন, তা পর্যাপ্ত নেই। পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষি বিজ্ঞানীদের অবদানকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয় না।
বাংলাদেশে চিকিৎসা, প্রকৌশল কিংবা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাজের চেয়ে কৃষি গবেষকদের কাজ সরাসরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। কিন্তু এত কিছুর পরও সমাজে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দৃশ্যমানতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অনেক সময় সমাজ এই কৃষি গবেষণাকে একটি “কম আকর্ষণীয়” ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অথচ দেশের মানুষের মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পেছনে এই খাতের অবদানই সবচেয়ে মৌলিক ও প্রধান ভিত্তি।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, কেন অধিক মূল্যায়ন প্রয়োজন?
ভবিষ্যতের জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্যই এই কৃষি গবেষকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বেশি মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশ আগামী দিনে বেশ কিছু জটিল সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে আবাদি কৃষিজমি ক্রমাগত হ্রাস পাবে। তৃতীয়ত, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। চতুর্থত, সবার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। পঞ্চমত, জলবায়ু ও বাজার সংকটের কারণে কৃষকের আয় সংকট আরও তীব্র রূপ ধারণ করতে পারে। এই সমস্ত বহুমাত্রিক জাতীয় সংকট ও চ্যালেঞ্জগুলো দূরদর্শিতার সাথে মোকাবিলা করতে আগামী দিনে কৃষি গবেষকদের ভূমিকাই হবে দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য।
এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণে রাষ্ট্রীয় নীতিতে কিছু জরুরি পরিবর্তন আনা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রথমত, জাতীয় বাজেটে কৃষি গবেষণার জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষকদের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা ও গবেষণার অনুকূল পরিবেশ প্রদান করা জরুরি। তৃতীয়ত, একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদকের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও সম্মাননায় দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জাতীয় দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পঞ্চমত, ল্যাবরেটরির নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে মাঠপর্যায়ে ও কৃষকের আঙিনায় দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য একটি আধুনিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং টেকসই কৃষির ভিত নির্মাণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের অবদান ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য। তারা সর্বদা প্রচারের আড়ালে থেকে নীরবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন, কিন্তু সেই ত্যাগের তুলনায় রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়। যে জাতি তার কৃষি বিজ্ঞানীদের উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারে না, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। তাই সময় এসেছে কৃষি গবেষকদের এই অসামান্য অবদানকে শুধু একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে, সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়ার।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...