Logo Logo

ডুবছে হাওর, কাঁদছে কৃষক: রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান এখনই জরুরি


Splash Image

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট অকাল বন্যায় আবারও তলিয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান। ঋণের বোঝা আর সারা বছরের খোরাকি হারানোর চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। পানিতে নিমজ্জিত ফসলের মাঠে বৃদ্ধ কৃষকের আহাজারির দৃশ্য কেবল তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। দেশের উৎপাদিত ধানের একটি বড় অংশ এবং সারাদেশের মাছের ২৫-৩০ শতাংশ আসে এই হাওর থেকেই। তাই হাওর ডুবলে শুধু কৃষক নয়, সংকটে পড়ে পুরো বাংলাদেশ। ভোরের বাণী’র পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে উত্তরণে এখন শুধুই সাময়িক ত্রাণের বদলে প্রয়োজন একটি স্থায়ী ও টেকসই মহাপরিকল্পনা।


বিজ্ঞাপন


২০১৭ সালের অকাল বন্যায় ফসলহানির ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা দেশবাসীর এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সেবার ধান পচে অ্যামোনিয়া গ্যাসে হাওরের মাছ ও হাঁসের ব্যাপক মড়ক দেখা দিয়েছিল। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও হাওরের এই দুর্যোগের কোনো স্থায়ী সমাধান আমরা দেখতে পাইনি। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের নামে বছরের পর বছর কেবল 'চোরাবালির ফাঁদ' তৈরি হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কৃষককে। হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার লাখ লাখ মানুষ এক ফসলি বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এই এক ফসলি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে কৃষিজ উৎপাদনের বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। হাওরে এখন ৯০-১২০ দিনের মধ্যে ঘরে তোলা সম্ভব এমন ধানের চাষাবাদকে জনপ্রিয় করতে হবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বছর মেয়াদি ‘হাওরের দুর্যোগ উত্তরণ কর্মসূচি’ ঘোষণা করা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি ও এনজিও ঋণ মওকুফ করে নতুনভাবে বিনা সুদে বা সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করতে হবে। বর্ষায় যাতায়াত খরচ কমানোর লক্ষ্যে বিজিবি বা নৌবাহিনীর মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে বা নিকটবর্তী বাজারগুলোতে রেশন ও ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। সিডরের মতো দুর্যোগের আদলে মোবাইল এসএমএস ও বিকাশভিত্তিক সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। একইসঙ্গে, প্রতি বছর বাঁধ ভাঙার স্থায়ী সমাধান হিসেবে হাওরের অকাল বন্যারোধী বাঁধগুলো সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণের ব্যবস্থা করা এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।

দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে হাওরের জন্য একটি ১০ বছর মেয়াদি ‘বহুমাত্রিক উন্নয়ন কর্মসূচি’ গ্রহণ করতে হবে। এর আওতায় একটি পৃথক ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন, হাওর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সুনামগঞ্জসহ হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোকে ‘হাওর ইকোনোমিক জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন। হাওরের নদীগুলো খনন, মেঘালয় থেকে নেমে আসা ঢলের মুখে জলাধার নির্মাণ, এবং বর্ষায় আফালের (ঢেউ) তাণ্ডব থেকে রক্ষায় করচ-হিজলের ব্যারিকেড তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, হাওরের পর্যটন খাতকে বিকশিত করতে খালিয়াজুড়ি, টাঙ্গুয়ার হাওর, নিকলী, তাহেরপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মাধ্যমে নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করা গেলে এটি দেশের অন্যতম লাভজনক খাতে পরিণত হবে। হাওরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিকগুলোর জন্য নিজস্ব স্পিডবোট বা ইঞ্জিন নৌকার ব্যবস্থা এবং হাওরের উপযোগী শিল্প স্থাপনে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে হাওরবাসীর অবদান অনস্বীকার্য। রাতা, টেফি, গচির মতো সুস্বাদু বিরল ধান এবং মহাশোল, আইড়, পাবদার মতো বিপন্ন দেশীয় মাছের আঁতুড়ঘর এই হাওরকে ‘প্রাকৃতিক মৎস্যভান্ডার’ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। হাওর উন্নয়ন বোর্ডের জনবল ও পরিধি বাড়িয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছায় হাওরের পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত হলে, আগামী দিনে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ থেকে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে হাওরাঞ্চল এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...