Logo Logo

ক্ষমতা যখন সাইকেলের প্যাডেলে, এক 'অদ্ভুত' প্রধানমন্ত্রীর গল্প


Splash Image

গাড়ির হুটার, কালচে কাঁচের পাজেরোর বহর, আর ‘রাস্তা ছাড়ো’ বলে সাইরেনের তীব্র আওয়াজ—উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ‘ক্ষমতা’ শব্দটার দৃশ্যরূপ ঠিক এমনই। অথচ এই পৃথিবীরই অন্য এক প্রান্তে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে বসেও এক ব্যক্তি যাপন করছেন এমন এক জীবন, যা আমাদের চেনা বাস্তবতায় প্রায় রূপকথা।


বিজ্ঞাপন


তিনি মার্ক রুটে। টানা প্রায় ১৪ বছর ইউরোপের অন্যতম উন্নত দেশ নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) শীর্ষনেতা বা সেক্রেটারি জেনারেল। কিন্তু এই বিপুল ক্ষমতার আড়ালে তাঁর যে পরিচয়টি বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি চমকে দেয়, তা হলো তাঁর অতি সাধারণ, আড়ম্বরহীন জীবনযাত্রা।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব হস্তান্তরের শেষ দিন। সাধারণত এমন দিনে রাষ্ট্রীয় বিদায় সংবর্ধনা, লাল গালিচা আর আবেগী বক্তৃতার মহড়া বসে। কিন্তু দ্য হেগের ডাচ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য।

অফিস থেকে বের হলেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী। হাতে একটি অ্যাপল ওয়াচ। কোনো বিশেষ তোড়জোড় নেই। পার্কিং স্ট্যান্ডে রাখা নিজের পুরনো ডাচ ‘কোগা’ ব্র্যান্ডের সাইকেলটি আনলক করলেন। এরপর প্যাডেলে চাপ দিয়ে সাধারণ রাস্তা ধরে একা একা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কোনো ট্রাফিক জ্যাম নেই, কোনো সাইরেন নেই। পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, কেউ আলাদা করে ভ্রুক্ষেপও করছে না যে দেশের সদ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন!

ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী একজন নেতার এমন বিদায় বিশ্বজুড়ে এক দারুণ বার্তা দিয়ে গেছে।

১৪ বছর একটি দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে থাকার পরও মার্ক রুটে কোনো বিলাসবহুল সরকারি বাংলোতে থাকেননি। দ্য হেগের একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টেই কেটেছে তাঁর পুরো প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়, যা তিনি ছাত্রজীবনে কিনেছিলেন।

আজকের যুগে যেখানে প্রতি বছর স্মার্টফোনের মডেল বদলানো একটা ফ্যাশন, সেখানে মার্ক রুটে বছরের পর বছর ব্যবহার করেছেন ২০১২ সালের একটি পুরনো বোতামওয়ালা নকিয়া (Nokia 301) ফোন। ডাচ গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালেও তিনি এই ফোনটি ব্যবহার করতেন কেবল টাইপ করতে সুবিধা হওয়ার কারণে। ফোনের স্টোরেজ কম থাকায় প্রতিদিন মেসেজ ডিলিট করতে হতো তাঁকে! তাঁর একটি ১৯৯৯ মডেলের পুরনো ভলভো গাড়ি আছে, তবে সেটিও তিনি খুব একটা গ্যারেজ থেকে বের করেন না।

প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় প্রতিদিন সাইকেল চালিয়েই অফিসে আসতেন রুটে। এমনকি ডাচ রাজা কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সাথে বৈঠক থাকলেও তাঁর বাহন ছিল ওই সাইকেলই। একবার আপেল খেতে খেতে সাইকেল চালিয়ে রাজপ্রাসাদে ঢুকে যাওয়ার তাঁর একটি ভিডিও নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল হয়েছিল।

মার্ক রুটের এই জীবনদর্শন আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ডাচ সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। নেদারল্যান্ডসে একটি দারুণ প্রবাদ আছে "সাধারণভাবে বাঁচো, ওটাতেই তুমি সবচেয়ে অনন্য।"

ডাচ সমাজে লোকদেখানো আভিজাত্য বা ভিআইপি সংস্কৃতিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। সেখানে একজন মন্ত্রী, এমপি বা প্রধানমন্ত্রী মূলত জনগণের করের টাকায় নিয়োজিত একজন কর্মী মাত্র। ডাচ সংস্কৃতির মূল কথাই হলো, "তুমি যতই উপরে যাও না কেন, তুমি সাধারণ মানুষের চেয়ে বড় নও।"

যদিও রুটের নিরাপত্তার জন্য অদৃশ্য একধরনের নিরাপত্তা বলয় ডাচ গোয়েন্দারা বজায় রাখতেন, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো প্রটোকলের দাপট তিনি কখনোই পছন্দ করেননি।

মার্ক রুটের এই জীবনচিত্র যখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন স্বভাবতই আমাদের চারপাশের চেনা সমাজটার কথা মনে পড়ে। আমাদের দেশে ক্ষমতার সমার্থক শব্দ যেন ‘প্রটোকল’। একজন মন্ত্রী বা পদস্থ কর্মকর্তার গাড়ি নির্বিঘ্নে যাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষের গাড়ি, এমনকি মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সকেও জ্যামে আটকে রাখা হয়। ক্ষমতা এখানে বিনয় নয়, বরং অহংকার আর দাপটের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

মার্ক রুটে প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতা মানেই চিরকাল চেয়ার আঁকড়ে ধরে রাখার মরণপণ চেষ্টা নয়। ক্ষমতা মানে দামি পাজেরোর বহর বা রাজকীয় বাংলোও নয়। ক্ষমতা আসলে এক বিরাট দায়িত্ব, যা সততা ও সাদামাটা জীবন দিয়েও সফলভাবে পালন করা সম্ভব।

আজকের জাঁকজমক আর প্রদর্শনীর দুনিয়ায় মার্ক রুটের এই সাইকেল যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের আসল মহত্ত্ব তাঁর পদবী বা প্রটোকলে থাকে না, থাকে তাঁর সরলতায়।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...