Logo Logo

টকশোতে ডা. তুষার

ড. ইউনূসের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফের দাবি: আসল সত্য কী?


Splash Image

সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে আলোচিত চিকিৎসক ডা. আবদুর নুর তুষার দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় বসে নিজের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফ করে নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বক্তব্যটি ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে ভোরের বাণীর অনুসন্ধানে এবং আদালতের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তথ্যের ভুল ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মূলত গ্রামীণ ব্যাংক এবং গ্রামীণ কল্যাণের দুটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


প্রথমত, টকশোতে যে ৬৬৬ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে, সেটি গ্রামীণ ব্যাংকের নয়, বরং ড. ইউনূস প্রতিষ্ঠিত আরেকটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান 'গ্রামীণ কল্যাণ'-এর। গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতির বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইন অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক কর অব্যাহতি পেয়ে আসছিল, ঠিক যেমনটা দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে। ২০১৩ সালে নতুন আইনেই এই সুবিধা বহাল ছিল। তবে ২০২১ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানটির ওপর কর আরোপ করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে বর্তমান সরকার অতীত আইনের ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ ব্যাংককে পুনরায় পাঁচ বছরের জন্য করমুক্ত সুবিধা প্রদান করে। এর সঙ্গে ৬৬৬ কোটি টাকার কোনো সম্পর্ক নেই।

দ্বিতীয়ত, ৬৬৬ কোটি টাকার কর বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'গ্রামীণ কল্যাণ'। এনবিআর এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি করলে, এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করেন ড. ইউনূস। তাদের যুক্তি ছিল— দেশের অন্যান্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠান যেমন মাস্তুল, বিদ্যানন্দ বা দারুস সুন্নাহ যদি করমুক্ত সুবিধা পায়, তবে গ্রামীণ কল্যাণ কেন পাবে না? দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন যে, গ্রামীণ কল্যাণকে কর দিতে হবে।

তবে এই রায়ের পরই বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বেঞ্চের জুনিয়র বিচারপতি এসএম মনিরুজ্জামান পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে গিয়ে লক্ষ্য করেন, সিনিয়র বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকার একসময় এই একই মামলায় ড. ইউনূসের বিপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল) হিসেবে লড়েছিলেন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো আইনজীবী কোনো মামলায় একপক্ষের হয়ে লড়লে, পরবর্তীতে বিচারক হিসেবে তিনি ওই মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারেন না। এটি সরাসরি 'স্বার্থের সংঘাত' বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট।

শুনানির দীর্ঘ ছয় মাসেও বিচারপতি খুরশীদ আলম এই তথ্য গোপন রেখেছিলেন। বিষয়টি নজরে আসার পর আইনি বাধ্যবাধকতা মেনেই জুনিয়র বিচারপতির আপত্তির প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের অক্টোবরে ওই রায় প্রত্যাহার (রিকল) করে নেয়। ড. ইউনূস ক্ষমতায় আসার কারণে এই রায় প্রত্যাহার হয়নি, বরং বিচারপতির তথ্য গোপনের কারণে আইনি প্রক্রিয়াতেই এটি বাতিল হয়। পরবর্তীতে এই গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালে বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকারকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

বর্তমানে গ্রামীণ কল্যাণের ওই মামলাটি প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় নতুন একটি বেঞ্চে বিচারাধীন রয়েছে। আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন যে প্রতিষ্ঠানটিকে কর দিতে হবে কি না। ফলে ড. ইউনূস ক্ষমতায় বসে নিজের ৬৬৬ কোটি টাকার কর মাফ করে নিয়েছেন— এমন দাবিটি বস্তুনিষ্ঠ নয়। গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, টকশোর মতো পাবলিক প্ল্যাটফর্মে কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করার আগে অতিথিদের আরও বেশি তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...