বিজ্ঞাপন
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পূর্ব বাদুরতলা এলাকায় হঠাৎ করে বিশখালী নদীর তীরে ভাঙন শুরু হয়। শুরুতে ভাঙন তুলনামূলক কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা তীব্র আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বেড়িবাঁধ, মানুষের চলাচলের সড়ক ও ফসলি জমির অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ শতক জমি নদীতে চলে গেছে।
ভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ৬৫ নম্বর বাদুরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাতায়াত ব্যবস্থায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র পথটি নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু যাতায়াতের পথ হারানো নয়, ভাঙন অব্যাহত থাকলে বিদ্যালয় ভবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নদীর পাড়ে বিদ্যালয়ের অবস্থান হওয়ায় দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাওন মল্লিক বলেন, “হঠাৎ করে নদীভাঙন শুরু হয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের একমাত্র সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখন ভাঙন যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিদ্যালয় ভবন নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। আমরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছি।”
বিদ্যালয়ের পাশাপাশি নদীভাঙনের কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে। ভাঙনকবলিত এলাকায় প্রায় দেড়শ একর জমিতে আমন ধানের চাষ রয়েছে। এসব জমি রক্ষার জন্য যে বেড়িবাঁধটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেটির অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় এখন জোয়ারের পানি সরাসরি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন নিয়ে তারা জমিতে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এখন বাঁধ ভেঙে নদীর পানি জমিতে ঢুকে পড়লে তলিয়ে যেতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানখেত। এতে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
আমন চাষি মো. শাহেব আলী খান বলেন, “অনেক কষ্ট ও খরচ করে আমরা আমন ধান চাষ করেছি। এখন ধান ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ারের পানি জমিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি ঢুকে গেলে পুরো ধানখেত তলিয়ে গিয়ে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এই এলাকায় প্রায় দেড়শ একর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। দ্রুত বাঁধ মেরামত করে পানি প্রবেশ বন্ধ না করলে কৃষকদের পথে বসতে হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।”
স্থানীয় মনির মাঝি বলেন, বিশখালী নদীর ভাঙন প্রতিবছরই আমাদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবার হঠাৎ করে বাঁধ ও সড়ক ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ভাঙন এখনই ঠেকানো না গেলে সামনে আরও বড় ক্ষতি হবে। বিদ্যালয়, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমানে যে অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে তা দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে নদী আরও ভেতরের দিকে ঢুকে পড়তে পারে। এতে বিদ্যালয় ভবন, সড়ক, বেড়িবাঁধ ও আশপাশের বসতিসহ আরও বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে আমন মৌসুমে বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করলে শুধু ফসলের ক্ষতি নয়, দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হতে পারে। তাই ভাঙনস্থলে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী বলছেন, নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আকস্মিকভাবে বাঁধ ও সড়ক ভেঙে যাওয়ায় এবার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সামান্য ভাঙন বড় ধরনের দুর্যোগে রূপ নিতে পারে।
তাদের দাবি, ভাঙনকবলিত এলাকায় দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও সড়ক সংস্কার এবং বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, “পূর্ব বাদুরতলা এলাকায় বিশখালী নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ফসলি জমির ক্ষতির বিষয়টিও দেখা হবে। বিদ্যালয় ও স্থানীয় মানুষের চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ প্রতিদিন ভাঙন বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়বে। একদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দেড়শ একর আমন ধান রক্ষা—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হয়তো রক্ষা করা সম্ভব হবে বিদ্যালয়টি, বন্ধ করা যাবে নদীর আগ্রাসন এবং বাঁচানো যাবে কৃষকের মাঠের আমন ধান। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপে বিলম্ব হলে বিশখালীর ভাঙন শুধু একটি সড়ক বা বেড়িবাঁধ নয়, পুরো এলাকার কৃষি ও জনজীবনের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...