বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে সিপিডি ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।
‘সরকার কি প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক এ সংলাপে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু পাস করতে পারছে না। অন্যদিকে দেশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সবচেয়ে মেধাবী ব্যক্তিরাও শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এই তিনটি বড় সমস্যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পীড়িত করছে। এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলতে হলে সবার আগে মানসম্মত শিক্ষার বাংলাদেশ হতে হবে। যারা শ্রমজীবী মানুষের উত্থান চান, সেই উত্থান হতে হবে তাদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে। শ্রমজীবী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা এবং উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় আরও বলেন, যারা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেন, সেই নতুন বন্দোবস্তের অন্যতম ভিত্তি হতে হবে শিক্ষার অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। আর যারা ইনসাফের কথা বলেন, তাদের মনে রাখতে হবে—শিক্ষা থেকে বঞ্চনার চেয়ে বড় বেইনসাফি আর কিছু হতে পারে না।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নবনিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, জেন্ডার ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগ ও অংশগ্রহণ বাড়লেও নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের স্কোর এখনো আশানুরূপ নয়। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়ের সমতা নিশ্চিত হলেও ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার গুণগত মান ও জীবনদক্ষতা নিশ্চিত করতে শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। জিপিএনির্ভর পড়াশোনার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী জীবনদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে বিতর্ক ও খেলাধুলার মতো কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিভাবকদের জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। কারণ, জিপিএ-৫ কোনো সন্তানের মেধা বা যোগ্যতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলামের উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের সময়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ভর্তি, বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা এবং ছেলে-মেয়ের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসে এসব সাফল্য অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্যা ও কোভিড-১৯-এর মতো বড় ধরনের ধাক্কায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও স্পষ্ট হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষা খাতের অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান বিভাজনের কথা উল্লেখ করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সনদের মান সমান না থাকায় শিক্ষার্থীদের শিখনফল এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ২০০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গবেষক দল মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলো হলো—নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ইশতেহারের বাইরে গৃহীত নীতি ও পরিকল্পনা এবং বাজেটে রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলোর যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে কি না।
সিপিডির মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় শুধু প্রবেশগম্যতা বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা বা সাধারণ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সার্বিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ঘোষিত নীতিগুলোকে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...