কোটালীপাড়া উপজেলার বিল বাঘিয়ার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। ছবিটি সোমবার বিকেলে কলাবাড়ি ইউনিয়নের বাবুর খাল থেকে তোলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর থেকে কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত বিল বাঘিয়ার বাবুর খালের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শুরু হয় নান্দনিক এ নৌকা বাইচ। গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলাকাটা ও জয় নগর বাচারী নৌকা এতে অংশ নেয়। দুপুর থেকে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
নানা রঙে ও বিচিত্র সাজে সজ্জিত দৃষ্টিনন্দন নৌকাগুলোর পাল্লা দেখতে খালের দুই পাড়ে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। এ উৎসবের বাড়তি আকর্ষণ নৌকায় নৌকায় বসা ভাসমান মেলা। নৌকার বাইচ, বাদ্যযন্ত্রের তালে জারি-সারি গান এবং মাঝি-মাল্লাদের সম্মিলিত হেঁইও হেঁইও ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ঠিকারী ও কাঁশির বাদ্যের সঙ্গে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে খালের বুকে সৃষ্টি হয় এক মনোমুগ্ধকর আবহ। নৌকার মাঝি-মাল্লাদের উৎসাহ দিতে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সমর্থক ও দর্শকেরা। খালের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আনন্দ। একের পর এক নৌকার পাল্লা দেখতে দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো কালিগঞ্জ এলাকা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনেও দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে নৌকা বাইচ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তৃতীয় ও শেষ দিনে দুপুরে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় শেষ হবে এ উৎসব। এর মধ্য দিয়ে তিন দিনের এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটবে, ভাঙবে হাজারো মানুষের মিলনমেলা।
কবি, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক রবীন্দ্রনাথ অধিকারী জানান, নিম্ন জলাভূমি বা বিলবেষ্টিত কোটালীপাড়া একসময় তালিমপুর-তেলিহাটি পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা।
প্রায় দুই শতাব্দী আগে লক্ষ্মীপূজার সময় এলাকার মানুষ নৌকা নিয়ে তালিমপুর-তেলিহাটির জমিদার শিবরাম চৌধুরীর বাড়িতে যেতেন। পূজা শেষে বাড়ি ফেরার পথে নৌকায় নৌকায় পাল্লা হতো। নৌকার মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের এ ধারণা থেকেই জমিদার শিবরাম চৌধুরী বিল বাঘিয়ায় নৌকা বাইচের প্রচলন করেন। সেই থেকে লক্ষ্মীপূজার পরের দিন থেকে এ অঞ্চলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা বাইচ উৎসব হয়ে আসছে।
রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, আয়োজন ছাড়াই তিন দিনব্যাপী এত বড় নৌকা বাইচ উৎসব দেশের অন্য কোথাও হয় কি না, তা তাঁর জানা নেই।
কোটালীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার হাওলাদার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এ নৌকা বাইচ দেখে আসছেন। কখনোই কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে এর আয়োজন করতে হয় না। মাঝি-মাল্লারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা নিয়ে এসে এ উৎসবে অংশ নেন। এখানে কোনো আয়োজক কমিটি নেই, পুরস্কারের ব্যবস্থাও নেই। তারপরও প্রায় ২০০ বছর ধরে এ ঐতিহ্য টিকে আছে।
তিনি বলেন, “এটি কোটালীপাড়ার একটি ঐতিহ্য। সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমরা এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখব।”
কালিগঞ্জের নৌকা বাইচ দেখতে আসা শিক্ষার্থী অনন্যা হালদার, প্রিয়ন্তি রায় পিউ ও গৃহবধূ জ্যোৎস্না অধিকারী বলেন, তাঁরা জীবনে বিভিন্ন স্থানে নৌকা বাইচ দেখেছেন। তবে এখানকার মতো এত বড়, রঙিন ও রাজকীয় ঢঙের নৌকা বাইচ আর দেখেননি।
তাঁদের মতে, নৌকার বৈচিত্র্যময় সাজসজ্জা, মাঝি-মাল্লাদের প্রতিযোগিতা এবং দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এ উৎসবকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ারবাড়ি গ্রামের নৌকা বাইচে অংশগ্রহণকারী সুকমল সরকার বলেন, তিন দিনের এ উৎসবে অংশ নিয়ে তাঁরা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেন, নিজেরাও আনন্দ উপভোগ করেন। শত শত বছর ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এ উৎসবে অংশ নিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এ ঐতিহ্য এগিয়ে নেবে বলে আশা করেন।
তিনি বলেন, আগে বিলে নৌকা বাইচ হতো। বর্তমানে বিলে পানি না থাকায় খালে বাইচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খাল যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন নৌকা বাইচও টিকে থাকবে। এ কারণে তিনি বাবুর খাল সংরক্ষণের দাবি জানান।
কলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট বিজন বিশ্বাস মুঠোফোনে বলেন, নদীমাতৃক এ অঞ্চলের দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়া বিলের নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখতে হবে। আবহমান গ্রামবাংলার প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও নিজস্বতা আগামী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে বিল বাঘিয়ার এ নৌকা বাইচ আজও কোটালীপাড়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে। তবে এ ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে বাবুর খালসহ সংশ্লিষ্ট জলপথ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...