বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাসও পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পাঠ্যবইয়ে। ইতিহাস, কবিতা, গদ্য ও ইংরেজি পাঠের মাধ্যমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে ইতিহাসের পুনর্লিখন
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’–এর পাঠ–৯ এ ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ শিরোনামে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ছবি ও বিবরণ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও সেই ঘোষণা পাঠ করেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
একই বইয়ের পাঠ–১০ এ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে যুক্ত হয়েছে নতুন পরিচ্ছেদ। এখানে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
এই অধ্যায়ে শহীদ নূর হোসেনের ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ঐতিহাসিক ছবি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করা প্রতীকী ছবিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যাংশে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিরোধী মত দমন, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর করার মধ্য দিয়ে একটি ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংস দমন-পীড়ন চালায়।
১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা ঘোষণা আসে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান— যা ইতিহাসে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে চিহ্নিত হয়।
কবিতা, প্রবন্ধ ও ইংরেজি পাঠে আন্দোলনের মানবিক রূপ
সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই ‘সপ্তবর্ণা’–য় কবিতা অংশে যুক্ত হয়েছে হাসান রোবায়েতের লেখা ‘সিঁথি’। পাঠ-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলন ছিল এক নির্মম ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হলেও এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মানুষ নতুন করে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। কবিতায় শিক্ষার্থী-জনতার আত্মত্যাগ, রক্তপাত এবং মুক্তির প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।
একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এতে কোটা আন্দোলন দমন করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের সাহিত্য কণিকায় ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসে তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান হয়েছে— ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন এবং সহস্র মানুষের জীবন উৎসর্গের বিনিময়ে তা সফল হয়।
অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, পটভূমি ও ফলাফল আলাদা পরিচ্ছেদে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরামের নিহত হওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ের প্রবন্ধ ‘আমাদের নতুন গৌরবগাথা’–য় ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, কারফিউ উপেক্ষা করে মানুষের রাজপথে নেমে আসা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, ইংরেজি বই ‘English For Today’–এর ১৬ নম্বর অধ্যায় ‘Graffiti’–তে জুলাই আন্দোলনে গ্রাফিতির ভূমিকার পাশাপাশি শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু ও তার মায়ের হৃদয়বিদারক উক্তি— ‘হামার বেটাক মারলু কেনে?’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের স্বাগত, নতুন প্রজন্ম পাবে সত্য ইতিহাস
পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ও অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম বলেন,
“জুলাই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না। এটা ছিল শিক্ষার্থী ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে কীভাবে মানুষ হত্যা করা হয়েছে— সেই সত্য এখন পাঠ্যবইয়ে এসেছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর মিথ্যা ইতিহাস পড়ে বড় হবে না।”
তিনি আরও বলেন, পাঠ্যবইয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস পুনঃসংযোজন ইতিহাসকে খণ্ডিত না করে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপনের একটি ইতিবাচক প্রয়াস।
পাঠ্যবই সরবরাহের সর্বশেষ অগ্রগতি
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের ৮৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি বইগুলো আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০টি বই শতভাগ মুদ্রণ সম্পন্ন করে ১৬ ডিসেম্বরের আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪টি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে মুদ্রণ, পিডিআই ও সরবরাহ কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি www.nctb.gov.bd
ওয়েবসাইটে সব স্তরের ৬৪৭টি পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ ইতোমধ্যে আপলোড করা হয়েছে।
চলমান অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের অবশিষ্ট সব পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...