Logo Logo

গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রশ্ন

কর্ণফুলীতে যুবককে ২৬ ঘণ্টার বেশি থানায় আটকে রাখার অভিযোগ


Splash Image

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় মোহাম্মদ আরাফাত (২৬) নামে এক যুবককে দীর্ঘ সময় থানায় আটকে রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


পরিবারের দাবি, গত ৬ জুন দুপুরে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও প্রায় ২৬ ঘণ্টারও বেশি সময় পর আদালতে পাঠানো হয়। এ সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল কি না, কখন মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং কোন আইনি ক্ষমতাবলে তাকে থানায় আটকে রাখা হয়েছিল—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৬ জুন ২০২৬ শনিবার দুপুর আনুমানিক ২টার পর কর্ণফুলীর শাহ আমানত সেতুর নিচ সংলগ্ন পশ্চিম পাশে এস আলম জেটি এলাকার ইলিয়াস সওদাগরের দোকানের সামনে থেকে এসআই জাকির হোসেন মোহাম্মদ আরাফাতকে আটক করেন। পরে একটি সিএনজি অটোরিকশাযোগে তাকে কর্ণফুলী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টার আগেই তাকে থানার হাজতে রাখা হয়। তবে আটকের সময় তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা লিখিত অভিযোগের বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি।

আটক আরাফাতের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার বলেন, চাকরি থেকে বের হয়ে বিকেল ৩টার দিকে তিনি জানতে পারেন পুলিশ তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে থানায় গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমদিকে পুলিশ কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়নি।

তার দাবি, “আমি থানায় গিয়ে জানতে চাই আমার স্বামীকে কেন আটক করা হয়েছে। তখন কোনো সদুত্তর পাইনি। পরে বলা হয় তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। আমি কাগজ দেখতে চাইলে দেখাতে পারেনি। বরং অকথ্য ভাষায় কথা বলে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ৯৯৯-এ কল করে ওসির সঙ্গে দেখা করি, এরপরও কোনো স্পষ্ট উত্তর পাইনি।”

তিনি আরও বলেন, “পরে ওসির সঙ্গে দেখা করতে গেলে বলা হয়, তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কিছু না পাওয়া গেলে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমি রাত ৩টা পর্যন্ত থানায় ছিলাম। কিন্তু পরদিন দুপুরে জানতে পারি, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়েছে।”

ঘটনার বিষয়ে ৬ জুন দিবাগত রাতে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়।

রাত আনুমানিক ১টার দিকে ওসি শাহীনূর আলম জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। আরাফাতের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরে রাত প্রায় ২টার দিকে থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা (সেকেন্ড অফিসার) নুরুল ইসলামও জানান, আরাফাতকে নিয়ে তদন্ত চলছে, তবে তখনও তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।

এরপর ৭ জুন সকাল ৯টা ৬ মিনিটে থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মামলা হয়েছে কি না তিনি নিশ্চিত নন, পরে জানাবেন। সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আরাফাতের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। একই দিন সকাল ১১টার দিকে আবার যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার কাছে তখনও কোনো মামলা রেকর্ড আসেনি।

তবে দুপুর ১২টার দিকে থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আরাফাতের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে।

পরবর্তীতে জানা যায়, কর্ণফুলী থানার মামলা নং-১৭, তারিখ ০৭/০৬/২০২৬, পেনাল কোড ১৮৬০-এর ৩৮৫/৩৮৬ ধারায় আরাফাতের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়।

রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাদীর মালিকানাধীন দোকানের ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে আসামিরা ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে এবং পরবর্তীতে দোকানের মালিকের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে।

আবেদনে আরও বলা হয়, “বর্ণিত আসামীকে সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় ০৭/০৬/২০২৬ ইং তারিখ রাত ০৩:৫০ ঘটিকায় শিকলবাহা এলাকা হইতে গ্রেফতার করি।”

গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রশ্ন

এখানেই দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন। পরিবার, স্থানীয় সূত্র, সংশ্লিষ্ট সিএনজি চালক এবং বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, আরাফাতকে ৬ জুন দুপুর ২টার পর শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।

এছাড়া বাদীপক্ষের পরিবারের এক সদস্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে আগের দিন অর্থাৎ ৬ জুন আটকের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিবেদকের কাছে থাকা একাধিক ভিডিও, অডিও, রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ীও দাবি করা হচ্ছে, মোহাম্মদ আরাফাত ৬ জুন দুপুরের পর থেকেই পুলিশি হেফাজতে ছিলেন।

অন্যদিকে আদালতে দাখিল করা রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে ৭ জুন রাত ৩টা ৫০ মিনিটে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফলে প্রকৃত আটকের সময় এবং মামলার নথিতে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাদের প্রশ্ন, যদি আরাফাতকে ৬ জুন দুপুরে আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে রিমান্ড আবেদনে ৭ জুন রাত ৩টা ৫০ মিনিটে গ্রেপ্তারের কথা কেন উল্লেখ করা হয়েছে? আর যদি তিনি ৬ জুন থেকেই থানায় থাকেন, তাহলে ওই সময় থেকে মামলা রেকর্ড হওয়া পর্যন্ত তার আইনগত অবস্থান কী ছিল?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অযথা বিলম্ব না করে এবং সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বিধান রয়েছে।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ৬ জুন দুপুর ২টার পর আটক করার পর ৭ জুন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে আদালতে তোলা হয়। সে হিসাবে আটকের পর আদালতে উপস্থাপন করতে প্রায় ২৬ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, ওই সময়ের মধ্যে তাকে কোন আইনি ক্ষমতাবলে থানায় রাখা হয়েছিল এবং কখন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আরাফাতের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার দাবি করেন, তার স্বামী একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। আমার স্বামী টুকটাক ব্যবসা করে সংসার চালায়। তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। চাঁদা না দেওয়ার কারণেই তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসআই জাকির হোসেন বাদীপক্ষের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করে তার স্বামীকে মামলায় জড়িয়েছেন। এছাড়া থানার হাজতে তাকে মারধর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন।

সাদিয়া আক্তারের অভিযোগ, বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়ে এসআই জাকির হোসেন ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। আটকের সময় আরাফাতের কাছে থাকা প্রায় ২৮ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। পরে টাকা রেখে শুধু মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করবেন।

আরাফাতের স্বজনদের দাবি, যে জায়গাকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথা বলা হচ্ছে সেটি সরকারি জমি। সেখানে আরাফাত দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।

তাদের ভাষ্য, “অন্য ব্যবসায়ীদের মতো সেও মসজিদে ভাড়া দেয়। উল্টো তার কাছেই চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। চাঁদা না দেওয়ার কারণেই আজ তাকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।”

পরিবারের দাবি, বর্তমান মামলার পেছনে পূর্ব বিরোধও রয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর মোহাম্মদ আরাফাত রহমান খোকা চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আলী হোসেন লালু, ইমরান হোসেন ফাহিম, সোবহান, আব্দুর ছাত্তারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি, হামলা, লুটপাট ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি সিআর মামলা দায়ের করেছিলেন।

পরিবারের অভিযোগ, ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় পূর্ব বিরোধের জের ধরে বর্তমানে তাকেই চাঁদাবাজির মামলায় আসামি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে আটককারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে “থানায় আসছি” বলে ফোন কেটে দেন।

অন্যদিকে কর্ণফুলী থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরে থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুধু বলেন, “চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে।”

দীর্ঘ সময় থানায় আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে পারবেন না বলে জানান।

এদিকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিএমপির বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়টি আমি আপনার কাছে শুনলাম। কাউকে আটক করে বিভিন্ন কারণে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। এছাড়া হাজতে মারধরের কোনো সুযোগ নেই। সবমিলিয়ে আমি বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, “আমি বিষয়টি জেনে দেখি। এমন অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আটকের সময়, থানায় আনার সময়, হাজতে রাখার সময়, মামলা রেকর্ডের সময়, গ্রেপ্তার দেখানোর সময় এবং আদালতে পাঠানোর সময়সহ পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

তাদের মতে, এর মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং জনমনে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নগুলোর সুষ্ঠু উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে।

বর্তমানে মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে—যদি আরাফাতকে ৬ জুন দুপুরেই আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে মামলার নথিতে ৭ জুন রাত ৩টা ৫০ মিনিটে গ্রেপ্তারের কথা কেন উল্লেখ করা হয়েছে? আর আটকের পর মামলা হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কোন আইনগত অবস্থায় ছিলেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...