Logo Logo

কেমন আছে পদ্মা চরাঞ্চলের মানুষ?


Splash Image

পদ্মা সেতুর মতো দেশের অন্যতম আধুনিক ও মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়নে বদলে গেছে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা। অথচ প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোই, সেই পদ্মার বুকেই আধুনিক সব মৌলিক ও স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।


বিজ্ঞাপন


উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের দুর্গম দুইটি চরে গত চার বছর ধরে ২ হাজার মানুষের জন্য নেই কোনো হাসপাতাল কিংবা স্থায়ী চিকিৎসক। প্রসব বেদনা উঠলে প্রসূতি মাকে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিশাল পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে নিয়ে যেতে হয় দূরের সদর হাসপাতালে। যোগাযোগ ও চিকিৎসার এই অকল্পনীয় দুর্ভোগ যেন এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরজানাজাত ইউনিয়নের ‘ভূমিহীন’ নামক এলাকাটি ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নদীভাঙনে ৭০ শতাংশ বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের দিকে পদ্মার বুকে আবারও নতুন করে চর জেগে ওঠে। ২০২২ সাল থেকে সেখানে মানুষ নতুন করে বসতি স্থাপন শুরু করে, যা বর্তমানে প্রায় ২ হাজার মানুষের এক জনবহুল চরে রূপান্তরিত হয়েছে। চরের অধিকাংশ মানুষ মূলত কৃষিকাজ ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নদী পথে খেয়া পারাপারই এখানকার চরের মানুষের একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা আর স্বাস্থ্য খাতের চরম অবহেলায় এখানকার জীবন দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য এই চরে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। ফলে সামান্য অসুখ-বিসুখেও চরের মানুষ নিরুপায় হয়ে ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ কবিরাজ-পল্লী চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জরুরি কোনো রোগী হলে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় ধরে বিশাল পদ্মা নদীপথ পাড়ি দিয়ে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়াই একমাত্র ভরসা। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত এবং নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহন করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য এখানে কোনো সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও নেই।

এখানে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী জীবনঝুঁকি নিয়ে ঘরেই ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি চরের শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা, ডায়রিয়া ও মৌসুমী জ্বরের প্রকোপও উদ্বেগজনক।

আক্ষেপ প্রকাশ করে জব্বার মোল্লা (৬৫) নামের এক চরের বৃদ্ধ বলেন, "আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। হঠাৎ শ্বাস উঠলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো উপায় এখানে নেই। নদী পার হতে হতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।" তিনি আরও বলেন, "নির্বাচনের আগে কত জন কত প্রতিশ্রুতি দিল—হাসপাতাল হবে, রাস্তা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই কথা রাখে নাই। আমরা শুধু শুনেই গেছি, বাস্তবে কিছুই পাই নাই। আমাদের কষ্ট যেন কারও চোখেই পড়ে না।"

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, "উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও জনবল সংকটের কারণে এই দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে একজন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন ওই এলাকায় সেবা দিচ্ছেন। আমরা এই নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেব।"

তিনি আরও জানান, চরের প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি চরে একটি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য ৩০ শতাংশ জমির প্রয়োজন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কমিটির মাধ্যমে জমি পাওয়া গেলে দ্রুত ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...