বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় চব্বিশ হলের দ্বিতীয় তলার করিডোরে হল প্রভোস্টের উপস্থিতিতেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. ইনামুল হক, যিনি বাংলা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যায়নরত এবং নিজেকে শিবিরকর্মী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লিখিত অভিযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন এবং ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবসহ অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনকে অভিযুক্ত করেছেন।
এদিকে, ভুক্তভোগী ইনামুল হকের বিরুদ্ধেও পাল্টা মারধরের অভিযোগ এনেছেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব। মেসের এক মিটিংয়ে সাকিবকে মারধর করার প্রতিবাদে তিনিও প্রক্টর বরাবর পাল্টা লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের মতে, হলের দ্বিতীয় তলার টিভি রুম থেকে তারা দেখতে পান ২০-২৫ জনের একটি দল এক শিক্ষার্থীকে মারধর করতে করতে টিভি রুমের দিকে নিয়ে আসছে। তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এগিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী ইনামুল হক উল্লেখ করেন, গত মঙ্গলবার তার মেসের সদস্যদের মধ্যে সাধারণ একটি মনোমালিন্য হয়, যা মেস জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং পরবর্তীতে তা সমাধানও হয়ে যায়। কিন্তু এর জের ধরে বুধবার বিকেল ৪টার দিকে ইতিহাস বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল সভাপতি মোশাররফ হোসেন তাকে বিজয় চব্বিশ হলে ডেকে এনে অপেক্ষা করতে বলেন। অভিযোগ পত্রে বলা হয়, অপেক্ষারত অবস্থায় ইতিহাস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৌরভ ও সাকিবের নেতৃত্বে এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অংকনের উপস্থিতিতে ২০ থেকে ২৫ জন তার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করে।
অভিযোগে তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে তার মাথায় আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি আত্মরক্ষার্থে হলের প্রভোস্টের কক্ষে আশ্রয় নেন। প্রভোস্টের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি না থাকলে তার জীবননাশের আশঙ্কা ছিল। পুরো হামলার ঘটনাটি হলের দ্বিতীয় তলার সিসিটিভি ক্যামেরার সামনেই ঘটেছে। ইনামুল হক একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্যাম্পাসে ‘মব’ সংস্কৃতি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবের অভিযোগ ভিন্ন। তিনি জানান, মেসের এক মিটিংয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইনামুল হক তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। সাকিব নিজে একজন স্ট্রোকের রোগী হওয়া সত্ত্বেও ইনামুল তাকে চড় মেরে মেঝেতে ফেলে দেন এবং মেসের অন্য শিবিরকর্মীদের নিয়ে পুনরায় হামলা চালান। এরপর রাত আড়াইটায় তাকে ও সৌরভকে মেসের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। সাকিবও এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি পূর্ব-মীমাংসিত বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী মহলের মদদে বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থীর ওপর হলের ভেতর যে নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। প্রভোস্ট স্যারের সময়োচিত উপস্থিতি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরেকটি ‘আবরার ফাহাদ’ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার সাক্ষী হতে হতো।
তবে হামলার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন। তিনি বলেন, “সমস্যা সমাধানের জন্য ছাত্রদল সভাপতি মোশাররফ ভাই আমাকে ডাকলে আমি জুনিয়রদের নিয়ে হলের টিভি রুমের দিকে যাই। সেখানে মারামারি শুরু হলে আমি তা থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করি এবং ইনামুল ভাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মেসে ঘটে যাওয়া বিরোধের সমাধানের জন্যই আমি উভয় পক্ষকে হলে ডেকেছিলাম। আমি হলের অন্য একটি কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকায় তাদের অপেক্ষা করতে বলি। এর মধ্যে ইতিহাস বিভাগের কিছু জুনিয়র শিক্ষার্থীর সাথে মারধরের ঘটনাটি ঘটে, যা আমি আগে থেকে জানতাম না।”
বিজয় চব্বিশ হলের প্রভোস্ট মো. আরিফ উল ইসলাম জানান, ঘটনাটি মূলত অরাজনৈতিক এবং দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মেস সংক্রান্ত বিরোধের জের। প্রথমে বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী মেসে ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে। পরে হলের ভেতর সেই ঘটনার জেরে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাল্টা মারধর করে। হলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, “উভয় পক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকেরা আমার সাথে কথা বলেছেন। তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...