বিজ্ঞাপন
আমাদের সমাজে ‘ধার্মিকতা’ বলতে সাধারণত আমরা বাহ্যিক কিছু চর্চাকেই বুঝি—নিয়মিত নামাজ আদায়, জিকির-আজকার, কিংবা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান। এসব আমল নিঃসন্দেহে পুণ্যের কাজ। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে—ব্যক্তিগত আমলের গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যায় দেখে নীরব থাকাটা কি সত্যিকার অর্থেই পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জীবনবোধ?
আমাদের চারপাশে এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাদের আমরা শ্রদ্ধা করি, ‘বুজুর্গ’ হিসেবে গণ্য করি। সমাজের মানুষের কাছে তাদের কথা ও আচরণের গ্রহণযোগ্যতাও প্রচুর। কিন্তু যখনই কোথাও সামাজিক অন্যায়, শোষণ কিংবা কারো ওপর জুলুম হতে দেখা যায়, এই প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই আশ্চর্যজনকভাবে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। অনেকের ধারণা, "আমি আমার নামাজ-কালাম নিয়ে আছি, ঝামেলায় গিয়ে কাজ নেই"—এই পলায়নপর মানসিকতাই কি পরোক্ষভাবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে না?
ইসলামি শরীয়াহর আলোকে বিচার করলে, অন্যায় প্রতিরোধ করা কেবল কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুষ্পষ্ট নির্দেশনা হলো, অন্যায় দেখলে তা হাত দিয়ে, মুখ দিয়ে বা অন্তত অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে হবে। হাদিসে এটিকে ‘ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যার কথা সমাজ শোনে, তিনি জুলুমের সামনে নীরব থাকেন—তখন সেই নীরবতাকে অন্যায়কারীরা তাদের শক্তির উৎস হিসেবে ধরে নেয়। সমাজের সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, তারা মনে করে এই অন্যায়টি সম্ভবত তেমন বড় কোনো বিষয় নয়। এভাবে নীরবতা এক ধরনের ‘মৌন সম্মতি’ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামে মজলুমের অধিকারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মজলুমের আর্তনাদ সরাসরি আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে দেয়। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক নজির রয়েছে যেখানে প্রাকৃতিক আযাব বা সামাজিক বিপর্যয় যখন আসে, তখন শুধু অন্যায়কারীই নয়, বরং যারা অন্যায় দেখেও চুপ ছিল, তারাও শাস্তির আওতাভুক্ত হয়েছে। কারণ, অন্যায় রোধে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও নীরব থাকা সরাসরি আল্লাহর হক ও বান্দার হকের প্রতি অবহেলা।
একজন মানুষ কেবল তখনই ‘বুজুর্গ’ বা প্রকৃত ধার্মিক হতে পারেন, যখন তার আমল ব্যক্তিগত সীমানা পেরিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারে ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত ইবাদত হলো নিজের আত্মার পরিশুদ্ধি, আর সামাজিক ন্যায়বিচার হলো সমাজের আত্মার পরিশুদ্ধি। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ পড়েন, তাকেই আবার আল্লাহর সৃষ্ট জীবের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়।
আজকের সমাজে আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময় এসেছে। ধার্মিকতা মানে কেবল নির্জন ইবাদত নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা। যে ব্যক্তি মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখেন, তিনি যদি নীরব থাকেন, তবে তার সেই স্তব্ধতা কেবল অন্যায়ের পক্ষই নেয় না, বরং তা নিজের ঈমানের দৃঢ়তাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।
সমাজকে অন্যায়মুক্ত করতে হলে ‘বুজুর্গি’র সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু তসবিহ হাতে নয়, বরং মজলুমের পাশে দাঁড়ানোর সাহসিকতাই হোক আজকের সময়ের প্রকৃত ধার্মিকতার পরিচয়।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...