বিজ্ঞাপন
হাওরের কৃষকের মাথায় এখন পাহাড়সম দুশ্চিন্তা। যে ফসল বিক্রি করে ঋণ শোধ করার কথা ছিল, যে গোলাভরা ধান দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল—সবই এখন পানির নিচে। হাওরের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন আজ লণ্ডভণ্ড। তাদের কাছে এখন জীবনযাত্রার মান নয়, বরং ‘বেঁচে থাকা’ই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। ২০১৭ সালের সেই বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস আর মাছের মড়কের স্মৃতি এখনো হাওরবাসীর মনে সজীব। এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রশ্ন জাগে—হাওর নিয়ে এত প্রকল্প, এত উন্নয়ন আসলে কাদের জন্য?
বাংলাদেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার পেছনে হাওরবাসীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর হাওরাঞ্চল থেকে প্রায় ৩০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ। এছাড়া মোট মাছের চাহিদার ২৫-৩০ শতাংশ মেটায় এই হাওর। শনির হাওরের উৎপাদিত ধান দিয়েই সারা বাংলাদেশের ছয় দিনের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কৃষকরা যদি টানা ১০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে ফসল ঘরে তুলতে পারেন, তবে সোনার বাংলা গড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। অথচ এই বীর কৃষকরাই আজ অবহেলিত।
হাওরের এই চিরচেনা সংকট থেকে উত্তরণে কেবল মৌসুমি ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা। স্থানীয়দের প্রাণের দাবির ভিত্তিতে আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি:
১. স্বতন্ত্র ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন: হাওরের কৃষি, পানি, মৎস্য ও পরিবেশের সমস্যাগুলো একটি অন্যটির পরিপূরক। তাই এসবের সমন্বয়ে একটি আলাদা মন্ত্রণালয় এখন সময়ের দাবি।
২. সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাঁধ নির্মাণ: সংস্কারের নামে বাঁধ যেন ‘চোরাবালির ফাঁদ’ না হয়। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
৩. নদী ও জলাশয় খনন: নদী, খাল ও বিল নিয়মিত খনন করলে পানির ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং অকাল বন্যার ঝুঁকি ৮০ শতাংশ কমে যাবে।
৪. দুর্যোগ উত্তরণ কর্মসূচি: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এক বছরের জন্য বিশেষ রেশন, কৃষিঋণ মওকুফ এবং নতুন করে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
৫. বহুমাত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা: সুনামগঞ্জকে কেন্দ্র করে হাওর বিশ্ববিদ্যালয়, ইকো-ট্যুরিজম, আধুনিক মৎস্য সংরক্ষণাগার এবং হাওর গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার হৃদস্পন্দন। হাওরের ধান ও মাছের ওপর নির্ভর করে কোটি মানুষের জীবন। তাই হাওরের বিপর্যয় কেবল হাওরবাসীর নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের। হাওর ডুবলে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের অর্থনীতিই ডুবে যায়।
মাননীয় খাদ্যমন্ত্রী ও হাওরাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আকুল আবেদন—হাওরের এই সংগ্রামী মানুষকে কেবল ধন্যবাদ নয়, তাদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিন এবং স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিন। নয়তো প্রতি বছর আমরা শুধু কৃষকের কান্না দেখব, আর রাষ্ট্র ব্যর্থতার নতুন ইতিহাস লিখবে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...