বিজ্ঞাপন
শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, সীমান্তের ভেতরের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনার বেশ কয়েকটি আসনেও এই জোট জয় পেয়েছে। আরও উত্তরে রাজশাহী–১ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের একাধিক আসনেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আংশিক আসাম সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের বিস্তৃত অঞ্চলে জোটটির শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। এই ফলাফল ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। কারণ, কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
সীমান্ত রাজনীতি ও অনুপ্রবেশ বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ ইস্যু বহুদিন ধরেই নির্বাচনী আলোচনার অংশ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে এবং রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলগুলো তা মদত দেয়। তাদের দাবি, এই অনুপ্রবেশের ফলে কয়েকটি জেলার জনবিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে।
বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে সীমান্ত অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করল—সেটি আলাদা আলোচনা হতে পারে; তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়বে, তা নিশ্চিত। তার অভিযোগ, দীর্ঘ সীমান্তের অনেকাংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ হয়নি এবং জমি অধিগ্রহণে রাজ্য সরকারের অনীহা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো সীমান্তপথে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের সাফল্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও জনসংখ্যা পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই বিজেপি বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনবে।
তৃণমূলের পাল্টা অবস্থান
অন্যদিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফলে বিএনপির জয়ের প্রতি প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফলাফল ঘোষণার দিনই বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রতি অভিনন্দন বার্তা পাঠান।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, হিন্দু মৌলবাদ ও ইসলামি মৌলবাদ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যেমন একটি কট্টরপন্থী শক্তি, ভারতে বিজেপিও তেমনই এক ধরনের মৌলবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি দাবি করেন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিজেপি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে, এবং সীমান্তের দুই প্রান্তেই ধর্মীয় মেরুকরণ রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
‘দ্য ওয়াল’ পোর্টালের কার্যনির্বাহী সম্পাদক অমল সরকার মনে করেন, সীমান্ত বরাবর জামায়াতের সাফল্য নতুন কিছু নয়। দেশভাগের পর থেকেই এসব অঞ্চলে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল। তাই এবারের ফলাফলকে সম্পূর্ণ নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের কৌশল অনুযায়ী বিষয়টি ব্যাখ্যা করবে বলেই তার ধারণা।
তিনি বলেন, বিজেপি হয়তো বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করবে যে সীমান্তে জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ফলে হিন্দু ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। তবে এই ব্যাখ্যা হবে বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান—এজন্য সরাসরি জামায়াতকে দায়ী করা যাবে না।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, আসাম সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকাতেও জামায়াত জোট ভালো ফল করেছে। একইসঙ্গে ভারতের ওই অঞ্চলগুলোতেই বিজেপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, সীমান্ত রাজনীতিকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় মেরুকরণ জোরদার করতে পারে।
তবে তিনি আরও বলেন, যদি তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাদেশের সামগ্রিক ফলাফলকে এমনভাবে তুলে ধরতে পারে যে সেখানে কট্টরপন্থীদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি বিজয়ী হয়েছে—তাহলে বিজেপির প্রচারের মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
সীমান্ত মানচিত্রের রাজনৈতিক তাৎপর্য
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আসনগুলোর ফলাফল যে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে—এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, দুই পক্ষ—বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস—কীভাবে সীমান্ত রাজনীতির এই নতুন বাস্তবতাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে।
আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের নির্বাচনী মানচিত্র তাই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন অনুষঙ্গ।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...