Logo Logo

সামনে কোরবানি, সীমান্তে নতুন কৌশলে চলছে গরু চোরাচালান


Splash Image

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী দোয়ারাবাজার উপজেলায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু-মহিষ চোরাচালান চক্র। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বোগলাবাজার, নরসিংপুর ও বাংলাবাজার এলাকাকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ভারতীয় গরুর বড় বড় চালান দেশে প্রবেশ করছে। আর অবৈধ উপায়ে আনা এসব গবাদিপশু সাময়িকভাবে লুকিয়ে রাখার জন্য খামারের আড়ালে গড়ে তোলা হয়েছে কথিত ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র'।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের দাবি, দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার এলাকায় খামারের অনুমোদন নিয়ে একাধিক স্থাপনা তৈরি করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর একটি বড় অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে চোরাই গরু রাখার অস্থায়ী ডিপো হিসেবে। কাগজপত্রে এগুলো বৈধ খামার হিসেবে নিবন্ধিত থাকলেও রাতভর ভারতীয় গরু রেখে সুনির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সেখানে প্রতিটি গরুর সুরক্ষার জন্য প্রতি রাতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘রাত্রিযাপন ফি’ আদায় করা হচ্ছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, দিনের বেলায় অধিকাংশ খামারেই গবাদিপশু লালন-পালনের তেমন কোনো দৃশ্যমান বা স্বাভাবিক কার্যক্রম নেই। বাইরে খড়, ঘাস ও খাদ্যের কিছু কৃত্রিম ব্যবস্থা দেখা গেলেও ভেতরে নিয়মিত খামার পরিচালনার আলামত মেলা ভার।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাত নামলেই এই খামারগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সীমান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন উপায়ে নিয়ে আসা গরু গভীর রাতে এসব খামারে ঢোকানো হয় এবং ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, বোগলাবাজার এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৮টি খামার রয়েছে। এর মধ্যে ৪টি নিবন্ধিত এবং বাকি ৪টি সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনিবন্ধিত। তাদের অভিযোগ, এসব খামারের কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় গরু রাখার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাতে খামারগুলোতে চোরাই গরু ভর্তি হয়, সকালে আবার সেগুলো উধাও হয়ে যায়। এতে স্থানীয় বাজারে গরুর দামে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এবং দেশের বৈধ খামারি ও ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বৈধ খামারের অনুমোদনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি অবৈধ গরু রাখার মতো রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে তা শুধু অবৈধ বাণিজ্যই নয়, সীমান্ত এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলার জন্যও এক বিরাট হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে গণমাধ্যম ও প্রশাসনে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদারকি ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবে চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য এবং সাংবাদিক পরিচয়ধারী কয়েকজন নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করেই চোরাচালানকারীরা এই অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে। যার ফলে মাঝেমধ্যে দু-একটি লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না এই কালো ব্যবসা।

এদিকে সীমান্তে গরু চোরাচালান এবং খামারের আড়ালে তা মজুত রাখার বিষয়টি সুনামগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও একাধিকবার গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। গত ৯ মে অনুষ্ঠিত মাসিক সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে স্থানীয়দের দাবি, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির নির্দেশনার পরও এখন পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

উল্লেখ্য, এর আগেও এই সীমান্তপথে বড় ধরনের গরু চোরাচালানের ঘটনা সামনে এসেছিল। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির একটি অভিযানিক দল টাস্কফোর্সের সহায়তায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদী এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় গরুবোঝাই একটি স্টিলবডির নৌকা আটক করা হয়। নৌকাটিতে থাকা ৯০টি ভারতীয় গরুর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। ওই ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

অবশ্য অভিযোগের বিষয়ে খামার মালিকদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েকজন মালিক দাবি করেন, সীমান্ত এলাকায় অনেক পাইকার বৈধভাবে গরু কিনে সাময়িক সময়ের জন্য তাদের খামারে রাখেন এবং পরে সুবিধাজনক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাটে নিয়ে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক খামার মালিক বলেন, আমরা কোনো অবৈধ বা চোরাই গরু রাখি না। যারা গরু নিয়ে আসে, তারা নিজেদের গরু বলেই ভাড়া নেয়। রাতে রাখার জায়গা চাওয়ায় মানবিক কারণে আমরা জায়গা দিই।

সার্বিক বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিংহ বলেন, খামারের অনুমোদন সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। তবে খামারের আড়ালে অন্য কোনো কর্মকাণ্ড চলছে কি না তা খতিয়ে দেখতে প্রাণিসম্পদ বিভাগকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বা অন্য কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, শুধু মাঝেমধ্যে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে এই শক্তিশালী চোরাচালান চক্র নির্মূল করা সম্ভব নয়। খামারের আড়ালে গড়ে ওঠা এসব কথিত ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র’ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সিলগালা করতে হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধনবিহীন খামার উচ্ছেদ, নিবন্ধিত খামারের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি, সীমান্তপথে বিজিবির নজরদারি বৃদ্ধি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তারা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...