বিজ্ঞাপন
কর্ণফুলী থানার মামলা নং-০৪, তারিখ ০২ মে ২০২৬, জিআর নং-১৭৫/২৬ অনুযায়ী দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৪০৬/৪২০/৩৭৯/১১৪/৫০৬ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার ভিকটিম মোঃ নুরুল আলম (৫৫), পিতা- মৃত ছৈয়দুর রহমান। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। মামলাটি দায়ের করেন তার ছেলে রুবায়েত আলম (২৬)।
গত ১৭ মে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস.এম. আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ভিকটিম নুরুল আলম। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, ১নং আসামি মোহাম্মদ শুয়াইব তার মামাতো বোনের দেবর এবং পূর্ব পরিচিত হওয়ায় তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে শুয়াইব তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়ে অবগত ছিলেন।
ভিকটিমের অভিযোগ, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জায়গা কিনে দেওয়ার কথা বলে শুয়াইব তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের শেষ দিকে শুয়াইব তাকে জানায়, পূর্বের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে।
এরপর শুয়াইব তাকে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের আক্তারুজ্জামান সেন্টারের সপ্তম তলায় অবস্থিত ‘এজেএম ট্রাভেল এন্ড ট্যুর’ নামীয় একটি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে ২নং আসামি মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর শুয়াইব, মাহফুজুর রহমান ও শহিদ নামে আরেক ব্যক্তি তাকে ডুলাহাজারা এলাকার একটি পাহাড়ি বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তি একটি বালতি নিয়ে আসে এবং বালতি থেকে একটি বোতল বের করে সেটি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয়। জবানবন্দি অনুযায়ী, আসামিরা হাতমোজা পরে বোতলটি লাইটের কাছে ধরলে লাইট নিভে যায় বলে দেখানো হয়। এতে সেটিকে ‘মূল্যবান গুপ্তধন’ হিসেবে বিশ্বাস করানো হয়।
পরে একাধিক বৈঠকে আসামিরা তাকে জানায়, বিদেশি বায়ারের কাছে ওই গুপ্তধন বিক্রি করলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে। এজন্য পাহাড়িদের ২ কোটি টাকা দিতে হবে বলে দাবি করা হয়। তখন মাহফুজুর রহমান ১ কোটি টাকা দেবেন জানিয়ে বাকি ১ কোটি টাকা নুরুল আলমকে দিতে চাপ দেন। সরল বিশ্বাসে তিনি তার ভাইদের কাছ থেকে টাকা এনে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক ও নগদে ১ কোটি টাকা প্রদান করেন।
কিছুদিন পর আসামিরা তাকে জানায়, গুপ্তধন নিয়ে আসার সময় আর্মি ক্যাম্পে তা আটক হয়েছে এবং ঢাকার এক আর্মি কর্মকর্তার স্ত্রীর মাধ্যমে সেটি ছাড়িয়ে আনতে বিপুল পরিমাণ টাকা লাগবে। পরে ধাপে ধাপে আরও টাকা নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন ভিকটিম। পূর্বে দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় নুরুল আলম আরও ২ কোটি টাকা প্রদান করেন বলেও উল্লেখ করেন।
এভাবে প্রায় দুই বছর ধরে নানা কৌশলে তাকে টাকা দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তাকে জানানো হয়, ৬৫ লাখ টাকা দিলে গুপ্তধন ছাড়ানোর “ফাইনাল” সমাধান হবে। তখন তিনি আগ্রাবাদের আক্তারুজ্জামান সেন্টারে থাকা তার ১০৬ নম্বর দোকান বিক্রি করে ৬৫ লাখ টাকা মাহফুজুর রহমানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠান।
এরপরও আসামিরা আরও ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করে। এক পর্যায়ে টেরিবাজারের বেশ কয়েকটি দোকান এবং কক্সবাজারে থাকা ২৪ শতক সম্পত্তি ৩ মাসের জন্য বন্ধক দিতে বলা হয়। জবানবন্দি অনুযায়ী, আসামিরা তাকে জানায় তাদের সহযোগী তানিয়া বেগম নামের এক নারীর কাছে এসব সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হবে। তবে ভিকটিম আদালতে বলেন, তিনি তানিয়া বেগমকে কখনো দেখেননি। পরে আসামিদের কথামতো তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পত্তিগুলোর কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, গত ২২ ফেব্রুয়ারি আসামিরা তাকে জানায় যে তারা গুপ্তধন উদ্ধার করে চট্টগ্রামে ফিরেছে। পরে আগ্রাবাদের অফিসে তাকে একটি প্যাকেট বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যার মধ্যে কথিত গুপ্তধন ছিল বলে দাবি করা হয়। তিনি সেটি নিয়ে সাতকানিয়ার বাড়িতে চলে যান।
পরে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলে ২৬ এপ্রিল তাকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ডাকা হয়। ভিকটিমের অভিযোগ, ২নং আসামি মাহফুজুর রহমানের থাইল্যান্ডের নাগরিক স্ত্রীকে বিদেশি বায়ার হিসেবে তার কাছে উপস্থাপন করা হয়। ওইদিন তিনি সাতকানিয়া থেকে পূর্বাণী বাসে চট্টগ্রাম আসার পথে কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকায় পৌঁছালে বাসের গতি রোধ করে ১০/১২ জন ব্যক্তি তাকে বাস থেকে নামিয়ে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর করে তার কাছে থাকা কথিত গুপ্তধন, ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার, ২৩১ সৌদি রিয়াল, নগদ ৮ হাজার টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের একটি চেকবই ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন—
১) মোহাম্মদ শুয়াইব (৫৫), পিতা- সালেহ আহাম্মদ, সাং- চিববাড়ী, খন্দকারপাড়া, থানা- সাতকানিয়া, জেলা- চট্টগ্রাম।
২) মোঃ মাহফুজুর রহমান (৪৫), পিতা- আজাহান গাজী, সাং- মুছাপুর হাতেম মিয়াজী বাড়ি, থানা- সন্দ্বীপ, জেলা- চট্টগ্রাম। বর্তমানে উত্তর পাহাড়তলী বিশ্ব কলোনী, থানা- আকবরশাহ, জেলা- চট্টগ্রাম।
৩) মোঃ আমিন হোসেন (৫৩), পিতা- মৃত লোকমান হোসেন, সাং- বিশ্ব কলোনী, আকবরশাহ ৯নং ওয়ার্ড, এন ব্লক, প্লট নং-১৩৫, থানা- আকবরশাহ, জেলা- চট্টগ্রাম।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার তিন আসামিকে পৃথক মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে ৪ দিন, একজনকে ৩ দিন এবং অপরজনকে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্তে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং প্রায় ১৫টি ব্যাংকের মোট ৪৬টি চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এ প্রতারণা চক্রের সদস্য সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পরিতোষ দাশ বলেন, “মামলার গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...