Logo Logo

রাজাপুর উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ১৫কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ


Splash Image

রাজাপুরের গালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে এপ্রোচ সড়ক বিহীন ব্রীজ৷

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয় ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় এবং বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই পদে থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, পুরোনো লোহার সেতুর মালামাল বিক্রির অর্থ আত্মসাত এবং প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় অভিজিৎ মজুমদার অনিয়মের ভিত্তি গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও ঠিকাদার নাসিম আকনের ঘনিষ্ঠ হন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর নাসিম আকনের মৃত্যুর আগে তিনি উপজেলা প্রকৌশলীর নানা অনিয়মের তথ্য জানতে পারেন। এরপর সমঝোতার মাধ্যমে প্রকৌশলীর দুর্নীতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের বিল ছাড়ের সময় ২ শতাংশ কমিশন গ্রহণ, পুরোনো লোহার সেতুর মালামাল বিক্রির অর্থ আত্মসাত, প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই সেতু নির্মাণ এবং প্রকল্পের সামান্য কাজ করে পুরো বরাদ্দ উত্তোলনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত তিন বছরে এসব খাতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজাপুর-কাঁঠালিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন কাজের কমিশন নিতেন না। ফলে ওই সময়ে ব্যাপক সংখ্যক সেতু, কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সুযোগে উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের একটি অংশ অপ্রয়োজনীয় স্থানে সেতু নির্মাণ, ভূয়া প্রকল্প এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন।

ঠিকাদারদের ভাষ্য, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আইবিআরপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে অনেক সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক এখনো নির্মাণ হয়নি কিংবা ভারী যান চলাচলের উপযোগী নয়। সরেজমিনে একাধিক সেতুতে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সেতুর অনেকগুলো বাস্তবে প্রয়োজন ছিল না এবং শুধু বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ৫০টি সেতুর পাইল নির্মাণ না করে কেবল বেইজ ঢালাইয়ের মাধ্যমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে উপজেলা প্রকৌশলী প্রায় ৫ কোটি টাকা অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি পুরোনো লোহার সেতুর মালামাল গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যে বিক্রি করে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, পুরোনো লোহার সেতুর মালামাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় রেজুলেশনের মাধ্যমে হস্তান্তরের কথা থাকলেও একাধিক জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, তারা এমন কোনো মালামাল পাননি।

গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও সাবেক সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২১ সাল থেকে দায়িত্বে থাকলেও তার ইউনিয়নে নির্মিত কোনো গার্ডার সেতুর পুরোনো লোহার মালামাল এলজিইডি হস্তান্তর করেনি।

সাতুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাইনুল হায়দার নিপুও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, তার ইউনিয়নের চারটি গার্ডার সেতুর পুরোনো লোহার সেতুর অধিকাংশ মালামাল ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়া হয়নি।

উপজেলা বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক নাসিম আকনের ভাই ও ঠিকাদার ফিরোজ আলম বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি অসমাপ্ত কয়েক কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিল নিতে গেলে উপজেলা প্রকৌশলী জানান, আগেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ কাজ সম্পন্ন করার সময় এ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলা হয়নি। এতে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপি প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি প্রকল্পের কাজ না করেই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ নামমাত্র সম্পন্ন করে অর্থ আত্মসাৎ এবং আরও ২০ লাখ টাকার কাজ কাগজে-কলমে ঠিকাদারের নামে দেখিয়ে সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে উপজেলা প্রকৌশলী নিজেই করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাব-কন্ট্রাক্টর মো. মজিবুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশে তিনি কয়েকটি কাজ করেছেন। ঢালাইয়ের সময় উপজেলা প্রকৌশলী খরচের টাকা দাবি করলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন।

স্থানীয় ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা হায়দার হোসেন বলেন, অভিজিৎ মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে রাজাপুর এলজিইডিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। ২০২৫ সালে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে এলজিইডি, দুদক ও মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি ওটিএম পদ্ধতিতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।

এদিকে সম্প্রতি শুক্তাগড় ইউনিয়নের সাংগর-গোপালপুর সড়কে প্রায় ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতু হস্তান্তরের আগেই ভেঙে পড়ার ঘটনাতেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

এসএ ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেডের ঠিকাদার মো. শহিদ অভিযোগ করেন, নৈকাঠি-লেবুবুনিয়া সড়কের কাজ শেষে বিল ছাড়ের জন্য উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। একইভাবে অন্য কয়েকটি প্রকল্পেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৭টি গার্ডার সেতু নির্মাণ হয়েছে এবং প্রতিটি সেতুর পুরোনো লোহার কাঠামোর ছবি ও তালিকা সংরক্ষিত রয়েছে। সব মালামাল সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সব সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। টিএন্ডটি সড়কের কালভার্টের পুরোনো লোহার মালামাল ঠিকাদারের জিম্মায় রয়েছে এবং প্রকল্প শেষ হলে তা বুঝে নেওয়া হবে। সাব-কন্ট্রাক্টর মজিবুর রহমানকে চিনলেও তার মাধ্যমে কাজ করানোর অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিম আকনের প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, তার সঙ্গে ঠিকাদার হিসেবে সুসম্পর্ক ছিল। নাসিম আকনের কিছু বিল বকেয়া ছিল। তবে তার ভাই ফিরোজ আলম অতিরিক্ত বিল দাবি করায় তা পরিশোধ করা হয়নি। এ কারণেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...