Logo Logo

গোপালগঞ্জে চান্দা বিলের ২ হাজার দিনমজুরের সংসারের চাকা ঘুরছে পাটে


Splash Image

গোপালগঞ্জের বিশাল জলাভূমি চান্দা বিল। প্রায় ১০ হাজার ৮৯০ হেক্টর আয়তনের এ বিলটি গোপালগঞ্জ সদর, মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার ১০৮ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। স্থায়ী ও ঋতুভিত্তিক মিঠাপানির এ জলাভূমি একসময় দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদের জন্য ছিল সমৃদ্ধ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, বিলে ধান চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং নির্বিচারে মাছ ও জলজ উদ্ভিদ আহরণের কারণে বিলের প্রাকৃতিক সম্পদ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।


বিজ্ঞাপন


একসময় বিলের মাছ, শাপলা ও শামুক আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অন্তত দুই হাজার দিনমজুর পরিবারের সদস্যরা। বর্তমানে এসব সম্পদ কমে যাওয়ায় তাদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তবে বর্ষায় চান্দা বিলের বিশাল জলরাশি এখন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। বিলের পানিতে পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ২০ গ্রামের দুই হাজার দিনমজুর পরিবার।

কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা, হাতিয়াড়া ও রাহুথড়; মুকসুদপুরের উজানী, বাসুদেবপুর ও বরমপাল্টা এবং গোপালগঞ্জ সদরের বরইভিটা, তেলিভিটা ও কালিভিটাসহ বিভিন্ন গ্রামের শ্রমজীবীরা এসব কাজে যুক্ত হয়েছেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এ কর্মযজ্ঞ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ২৪ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুকসুদপুরে ১০ হাজার ১৯৪, কাশিয়ানীতে ৭ হাজার ৯৩৩, গোপালগঞ্জ সদরে ৫ হাজার ১৮২, টুঙ্গিপাড়ায় ১ হাজার ৫৬৫ এবং কোটালীপাড়া উপজেলায় ৮১২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ফলন ধরা হয়েছে ২ দশমিক ০৫ মেট্রিক টন। সে হিসাবে জেলায় পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন।

মুকসুদপুর উপজেলার দাসেরহাট গ্রামের পাটচাষি আব্দুল করিম মিয়া বলেন, তিনি এ বছর দুই একর জমিতে পাট চাষ করেছেন এবং ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় এলাকায় পাট জাগ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পানি না থাকায় চান্দা বিলে পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিকদের আয় হচ্ছে। তবে বাড়িতে পাট তুলতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বর্তমানে হাটে প্রতি মণ পাট সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম।

চান্দা বিলের সিংগা গ্রামের ধনীন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, আগে বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে মাছ, শাপলা ও শামুক আহরণ করে সংসার চলত। এখন এসব সম্পদ না থাকায় বর্ষায় তিনি বেকার হয়ে পড়েন। তাই বর্তমানে পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ করছেন। এসব কাজ করে দিনে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। অক্টোবর পর্যন্ত এ কাজ চলবে। এরপর বিলের পানি কমলে কিছু মাছ পাওয়া যায় এবং ধান চাষের কাজ শুরু হয়।

হাতিয়াড়া গ্রামের শ্রমিক নমিতা বালা প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মোঠা পাটের আঁশ ছাড়ান। প্রতি মোঠার জন্য তিনি ৫ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। এতে দিনে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় হয়। তার মতো চান্দা বিল এলাকায় অন্তত এক হাজার নারী শ্রমিক আঁশ ছাড়ানোর কাজে যুক্ত রয়েছেন।

সিংগা আন্ধারকোঠা গ্রামের শ্রমিক অরবিন্দু মজুমদার জানান, তিনি প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ মণ পাট ধুয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পারিশ্রমিক পান। তার মতো অন্তত এক হাজার পুরুষ শ্রমিক পাট জাগ, ধোয়া ও শুকানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

পাট পরিবহনেও কর্মসংস্থান হয়েছে। মুকসুদপুরের দাসেরহাট গ্রামের নছিমনচালক স্বপন মোল্লা জানান, তিনি একটি নছিমনে প্রায় ৫০০ মোঠা পাট পরিবহন করেন। প্রতি মোঠায় ৫ টাকা হিসাবে এক ট্রিপে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া পান। ফেরার সময় পাটের আঁশ পরিবহন করে আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান বলেন, এ বছর জেলায় পাটের আবাদ প্রায় ৭০০ হেক্টর বেড়েছে এবং পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত পাট জাগ দেওয়ার জন্য সহায়ক হয়েছে। বর্তমানে শ্রমিকরা পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত। এসব কাজে শ্রমিকরা দৈনিক ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।

তিনি জানান, বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ পাট ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ পাটের দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা হলে কৃষকরা লাভবান হবেন। এ বিষয়ে সরকারের কাছে পাটের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে।

গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, গত জুলাই মাসে জেলায় ২৬ দিন বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময়ে মোট ৬৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি।

প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া চান্দা বিলের হাজারো শ্রমজীবী মানুষের কাছে পাটের মৌসুমি কাজ তাই এখন জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে। বিলের পানি যেমন পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এ কাজের আয়েই বর্ষায় সচল থাকছে বহু পরিবারের সংসারের চাকা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...