বিজ্ঞাপন
এর আগে লিবিয়ার এক বন্দিশালা থেকে তাঁর মুক্তির জন্য নেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে এবং দালালের বিচার দাবি করেছেন তাঁর স্বজনেরা। নিখোঁজ সাগর মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার কৃষক খবির মোল্লার ছেলে। তিনি গত বছরের ১৩ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তার সন্ধান চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদনও করেছেন তার মা বেলাতুননেছা। একই সঙ্গে দালালের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইবুনালে ৫ জনকে আসামি করে সাগরের মা বেলাতুননেছা একটি মামলাও করেছেন।
শনিবার বিকেলে নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই আকুতি জানায় নিখোজের মা বেলাতুননেছা।
নিখোঁজ তরুণের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সাগর ও তার পরিবার। পরবর্তীতে মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সাগর। পরে ২৩ লাখ টাকায় সাগরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে দালাল চক্রটি। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালেল ২ নভেম্বর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করে সাগরের পরিবার। টাকা নেওয়ার একদিন পর ৩ নভেম্বর সাগরকে নিয়ে আকাশপথে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখানে দুদিন রেখে মিশর হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়া। বাংলাদেশি দালাল চক্র তাঁকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। পরে সাগরকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে পরিবার থেকে চুক্তির ২৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ১৫ নভেম্বর রাতে সাগরকে লিবিয়ার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। নৌকাটি কিছুদূর যাওয়ার পথে লিবিয়ার সন্ত্রাসীদের হাতে আটক হয়েছে বলে সাগরের পরিবারকে জানায় দালাল চক্রটি। আটক অভিবাসনপ্রত্যাশী সাগরের মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পাওয়ার সাগরের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে বাংলাদেশি আরেক দালাল গোলাম মওলার (৪৮) মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য ৯ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। টাকা নেওয়ার পর থেকে সাগরের কোন সন্ধান দিতে পারছে না দালাল চক্রটি। সাগরের সন্ধান চেয়ে দালালদের কাছে বারবার ধরণা দেওয়া হলেও তারা আশ্বাস ছাড়া কোন খোঁজ গত দশ মাসেও দিতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে সাগরের মা বেলাতুননেছা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সন্তানের সন্ধান চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। একই সঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি দালালের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইবুনালে ৫ জনকে আসামি করে একটি মামলাও করেছেন তিনি।
নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান চেয়ে মা বেলাতুননেছা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাঁইচা থাকলে ছেলেতো যোগাযোগ করতো। ছেলেকে ফিরাইয়া দেওয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। দালাল খালি আশা দিচ্ছে। তারা (দালাল) এখনো কয় না আমার ছেলে নাই? আমার ছেলে আর নাই, এটা বুঝতে পারতাছি। আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি।’ দালালের বিরুদ্ধে মামলা করে উল্টো হয়রানি ও হুমকির মধ্যে পড়েছেন বলেও দাবি করেছেন বেলাতুননেছা। তিনি আরও বলেন, ‘মামলা দিয়েছি, চালাতে পারতাছি না। মামলা তুলে নিতে দাদালরা হুমকি দিচ্ছে। আমি বিচার চাই, ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলেরে ওরা কি করেছে সেটা জানতে চাই। আমার সোনারটুকরা বাবার সন্ধান চাই। ওই আমার ভরসা।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিখোঁজ সাগরের সহপাঠী নাসির ইসলাম বলেন, ‘সাগররা দুই ভাই এক বোন। ভাইদের মধ্যে সাগর বড়। পরিবারটি সাগরকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। ভিটেবাড়িটুকুও বন্ধক রাখা। তবুও যদি ওর সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে কষ্টটা থাকতো না। যারা সাগরকে প্রলোভন দিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়া নিছে, মুক্তিপণের জন্য টাকা নিছে সেই দালালদের বিচার চাই।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারী হলেও তিনি মূলত কাজ করেন শিবচর উপজেলার মির্জারচর সিপাইকান্দি এলাকার ইসমাইল ব্যাপারীর ছেলে গোলাম মওলার হয়ে। গোলাম মওলা মানবপাচার চক্রের অন্যতম একজন সক্রিয় সদস্য। তার অধীনে শিবচরসহ পুরো জেলায় অন্তত ১০ জন সহকারী রয়েছে। এই সহকারীরা টাকা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গ্রামের মানুষদের নানা প্রলোভন দিয়ে থাকেন। গোলাম মওলা ও তার সহকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও চক্রের সদস্যরা সবাই ধরাছোয়ার বাহিরে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে গোলাম মওলার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে নামজুল ব্যাপারী নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে বলেন, ‘আমি কোন দালালি করি না। এগুলো আমার নামে মিথ্যে অভিযোগ।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানবপাচার রোধে আমরা সব্বোর্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোন আসামিকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। অনেক মামলা আসামি দীর্ঘদিন ধরে দেশছাড়া। সাগরের মা তার সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলাটি আদালতে করেছে, সেটি সদর থানার পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ঘটনায় এক আসামিকেও ধরা হয়েছিল। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...