বিজ্ঞাপন
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি আমাদের বুকফাটা হাহাকার ও তীব্র বেদনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সব মানুষকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর সন্তান ও স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী হারিয়ে একা জীবনসংগ্রাম করা স্ত্রী এবং বাবার অপেক্ষায় শৈশব পার করা সন্তানদের যন্ত্রণা কোনোভাবেই ভোলার নয়। গুম-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধাদের প্রতি তিনি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জানান।
গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। গুম শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে কেড়ে নেয় তার প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্ব। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে কার্যত এসব অধিকারই একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।
গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ঘৃণ্য অপরাধ অস্বীকার করে গেছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে তিনি বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষের কথা উল্লেখ করেন। তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও বেদনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার ও আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মঞ্চে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এলেও দেশে এখনও এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যারা আর ফিরে আসেননি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশেই গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, একদিন বাংলাদেশেই গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার হবে।
তিনি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ বংশসহ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা সত্য শুধু বেদনাদায়ক নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট যে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বর কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো যে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কল্যাণমুখী, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছে—সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তেই সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সবশেষে রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।
তিনি বলেন, প্রতিটি গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পেতেই হবে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...