বিজ্ঞাপন
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামনে এসেছে অন্তত ছয়টি প্রশ্ন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তাঁর এক জুনিয়র বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান তাঁকে। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ‘আম্মু, আমি আসছি’ বলে মেসেজ পাঠান তিনি। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ। কিন্তু এরপর কী ঘটেছিল, তা এখনো অজানা।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তাঁর ছেলের এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচ থেকে ডাক দেন। মাকে জানিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বেরিয়ে যান তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) হেলাল বলেন, ঘটনার দিন প্রায় সারা দিনই মায়ের সঙ্গে ছিলেন তাহসিফ। মা-বাবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ ডাকলে মাকে জানিয়ে নিচে যান। এরপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
হেলাল বলেন, ‘সে অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির, অত্যন্ত সোশ্যাল। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। যেদিনের ঘটনা, সে সারাদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিল, শপিং করেছে, আমার জন্যও কিছু শপিং করেছে। সন্ধ্যার পরে দ্বীপ নামে ওর একটা বন্ধু ছোটভাই ওকে নিচ থেকে ডাকে। সে তার মাকে বলে, মা দ্বীপ আসছে, একটু কথা বলে আসি। এসব বলে নিচে যায়, আর ফেরেনি।’
ছেলের খোঁজে তাঁর মা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মেসেজ দিয়ে জানান, তিনি আসছেন। এরপর আর তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি পরিবার।
হেলাল বলেন, ‘এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, ও ফেরেনি। এবং রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সে মেসেজ দিয়েছে, সে আসছে। আম্মু আমি আসছি, এই রকম একটা মেসেজ দিয়েছে। এরপর থেকে তাকে আর লোকেট করতে পারিনি।’
ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলেও জানান হেলাল। তাঁর ভাষ্য, সেখানে পুলিশ তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু ওই দিন বিকেলেই উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।
হেলাল বলেন, ‘আমি তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম বুধবার দুপুরের দিকে। তারা (তুরাগ থানা) বললেন, এমন কোনো ব্যাড নিউজ নাই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। সন্ধ্যার আগে, সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার সঙ্গে কথা বললেন। আমার নাম, ছেলের নাম নিশ্চিত হয়ে তারপর আমাকে জানালেন যে, নদীতে ডেডবডি পাওয়া গেছে।’
মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাহসিফের বাবা বলেন, ‘এটা হলো রাজাবাড়ির ঘাটে। আটিপাড়া দিয়ে যেতে হয়। ওই এলাকায় আমার ছেলে কখনো যায়নি। এখন কারা বা কে তাকে হত্যা করেছে, এটা আমি জানি না।’
তবে তাহসিফের মৃত্যু হত্যাকাণ্ড কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ হওয়ার সময়কাল এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে পরিবারের বক্তব্য তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চাকরি ছাড়ার সঙ্গে পুরোনো অভিযোগের যোগসূত্র?
তাহসিফের বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভিডিওটি তাহসিফ ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন; এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
চাকরি থেকে অব্যাহতির সঙ্গে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তাহসিফের বাবা বলেন, পরিবারকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
হেলাল বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল কি না, এটা সে আদৌ করেছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের জানায়নি। এটা তার ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে। ওর ডিপার্টমেন্ট আমাদের সিম্পলি জানিয়েছে, এটা ডিসিপ্লিন অর্গানাইজেশন, ওর ইনডিসিপ্লিনারি কাজের কারণে ওকে ইস্তফা দেওয়া হয়েছে।’
তাহসিফ কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তাঁর বাবা বলেন, ছেলে হুমকি পাওয়ার কথা জানাননি। তবে কোনো একটি বিষয় নিয়ে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন।
হেলালের ভাষ্য, ‘সে হুমকি-ধামকির বিষয়ে আমাদের কিছু বলেনি। সে বলেছিল যে, সে একটু আশঙ্কা করছে। হুমকি বা থ্রেটের বিষয়ে সে কিছুই বলেনি।’
বিমান বাহিনী থেকে অব্যাহতির পর তাহসিফ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তাঁর বাবা জানান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ হয়ে সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন তিনি।
পডকাস্টে কী বলেছিলেন তাহসিফ?
মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আট দিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন তাহসিফ। গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে নিজের চাকরি ও বিমান বাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনকেও প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেছিলেন তাহসিফ।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। জবাবে তাহসিফ বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ভিডিওটি তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হলেও, ভিডিওটি তিনিই ধারণ করেছিলেন; এমন দাবি করা হয়নি। এ অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিমান বাহিনী থেকে অব্যাহতির সঙ্গে এ অভিযোগের সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তাহসিফ বলেন, এমনটি হতে পারে। তবে সবকিছু প্রকাশ করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘যে ঘটনাগুলো ৫ আগস্টের আগে-পরে ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’
এদিকে নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম ফেসবুকে দেওয়া এক বক্তব্যে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলেও মনে করেন তিনি। তবে এসব বক্তব্য ব্যক্তিগত সন্দেহ ও ধারণার ভিত্তিতে দেওয়া। এর পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে উত্তরখান থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। তাঁর হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। পরে সঙ্গে থাকা ফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ, নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টায় তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থানে কীভাবে পৌঁছালেন; এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি তাঁর শেষ মেসেজ, বাসা থেকে ডেকে নেওয়া ব্যক্তি এবং তাঁর নিজের বলা আশঙ্কার বিষয়টিও ঘটনার রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...