বিজ্ঞাপন
মাত্রাতিরিক্ত শীতের কারণে কৃষকরা মাঠে নামতে পারছেন না। এতে বোরো ধানের রোপণ বিলম্বিত হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে বোরো বীজতলা কোল্ড ইনজুরির ঝুঁকিতে পড়েছে বলে কৃষকরা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ বীজতলা সুরক্ষায় নানা পরামর্শ দিচ্ছে এবং বয়স্ক কৃষকদের মাঠে নামতে আপাতত নিষেধ করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপ-পরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান জানান, চলতি বছর জেলার পাঁচ উপজেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বীজতলার প্রয়োজন ধরা হলেও কৃষকরা ৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭০ হেক্টর বেশি।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বীজতলা বড় ধরনের কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়নি। কিছু এলাকায় আংশিক ক্ষতি দেখা দিলেও এতে সামগ্রিক চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে এ পর্যন্ত জেলায় মাত্র ১২ হাজার ৩৪৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এ আবাদ ছিল অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ এবার আবাদ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি তীব্র শীত ও কৃষকদের মাঠে নামতে না পারাকে দায়ী করেন।
ড. মামুনুর রহমান আরও জানান, কোল্ড ইনজুরি থেকে বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের সালফার কনটেন্ট বালাইনাশক স্প্রে, রাতে বীজতলায় পানি ধরে রাখা, সকালে পানি ছেড়ে দেওয়া এবং পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে জেলায় শীতের দাপট বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে বয়স্ক কৃষকদের মাঠে না নামার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী সাত-আট দিন একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করলে কৃষিতে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে ধান রোপণ শেষ করা গেলে উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।
এদিকে গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ৭ জানুয়ারি জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর তাপমাত্রা নেমে আসে ৭.৫ ডিগ্রিতে। গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে উত্তরের হিমেল হাওয়ার সঙ্গে ঘন কুয়াশা থাকায় শীতের তীব্রতা বাড়ে। সূর্যের দেখা কম পাওয়ায় শীত আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। তিনি জানান, ৭ জানুয়ারি থেকে মাঝে মাঝে রোদ দেখা গেলেও আগামী দু’দিন কুয়াশা বাড়তে পারে। তবে ১২ জানুয়ারির পর আবহাওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও শীতের প্রভাবের কথা জানাচ্ছেন। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক রইচ খোন্দকার (৬৫) বলেন, এলাকায় নিচু জমি বেশি হওয়ায় বছরে একবারই ধান হয়, যা দিয়েই পুরো বছর চলে। বর্তমানে শীতের কারণে জমিতে নামা যাচ্ছে না। বীজতলার চারা ঠিকমতো বাড়ছে না এবং অনেক জায়গায় চারা হলুদ বা সাদা হয়ে যাচ্ছে।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন বিশ্বাস (৫৫) জানান, তার তিন বিঘা জমি থাকলেও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই সাধারণত দেড় বিঘা জমিতে রোপণ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার তীব্র শীতে মাঠে নামা সম্ভব হচ্ছে না। শরীর কাঁপতে থাকে, বেশিক্ষণ মাঠে থাকা যায় না। এখন পর্যন্ত তিনি মাত্র ৩০ শতাংশ জমিতে ধান রোপণ করতে পেরেছেন।
কাশিয়ানী উপজেলার নিজামকান্দি গ্রামের কৃষক ফরমান আলী (৫০) বলেন, জমি প্রস্তুত ও চারা তৈরি থাকলেও শীতের কারণে ধান রোপণ করা যাচ্ছে না। এতে চারার বয়স বেড়ে যাচ্ছে, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
কোটালীপাড়া উপজেলার রাধাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বিজন মন্ডল (৫২) জানান, ধান রোপণ করতে না পারায় চারা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী স্প্রে, পানি ধরে রাখা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে বীজতলা রক্ষার চেষ্টা করছেন, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সঞ্জয় কুমার কুন্ডু বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার ৬৩১ মেট্রিক টন। তিনি জানান, ৭ জানুয়ারি থেকে রোদ উঠতে শুরু করায় কৃষকরাও নতুন উদ্যমে মাঠে নামছেন। সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে কৃষকরা শেষ পর্যন্ত আবাদ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে এবং জেলায় উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে লাভবান হবে—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...