বিজ্ঞাপন
এখানে জয়ের জন্য যেমন দরকার অভিজাত শ্রেণির সমর্থন, তেমনি প্রয়োজন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের ভোট। ফলে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশেও তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ।
মাসখানেক আগ পর্যন্ত এই আসনে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর পুরো চিত্র পাল্টে যায়। শেষ পর্যন্ত ঢাকা-১৭ আসন থেকেই প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেই। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত একজন নেতা এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—এ খবরে ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান মাঠে সক্রিয় ছিলেন। শুরুতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ প্রার্থী থাকায় জামায়াত প্রার্থী ও তার কর্মীদের মধ্যে স্বস্তির ভাব ছিল। দাঁড়িপাল্লার বিজয় নিয়ে আশাবাদও তৈরি হয়েছিল। তবে তারেক রহমান প্রার্থী ঘোষণার পর ধানের শীষের জোয়ারে কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে জামায়াত। তবুও আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন না দলটির প্রার্থী।
গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলনামূলক কঠোর এবং পরিবেশ শান্ত। ফলে প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির বসবাস এখানে বেশি। এর পাশেই কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তিতে বসবাস করেন বিপুল সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ। নির্বাচনে এই বস্তিবাসীর ভোটও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজের ও প্রয়াত মায়ের বাসার ঠিকানা হিসেবে পরিচিত এই এলাকাকে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান। এতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা গেছে। দলীয় কার্যালয় হওয়ায় প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন কর্মী-সমর্থকরা। ভার্চুয়ালি নিয়মিত দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন তারেক রহমান।
বস্তিবাসীদের মধ্যেও তারেক রহমানকে ঘিরে আশার সঞ্চার হয়েছে। কড়াইল বস্তির রিকশাচালক শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘শুনেছি তারেক রহমান এখান থেকে নির্বাচন করবেন। তিনি এমপি হলে ভালো হবে। আমরা তাকে ভোট দেব।’ একই মত চা দোকানদার আবদুস সামাদেরও। তার ভাষায়, ‘এখানে বিএনপির সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারবে না।’
প্রায় দুই দশক ধরে কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী আব্দুল আলিম বলেন, জনপ্রতিনিধিরা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রাখেন না। এবার এমন কাউকে ভোট দিতে চান যিনি বস্তির উন্নয়ন, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের পাশে থাকার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
অন্যদিকে অভিজাত এলাকার তরুণ ভোটারদের ভাবনায় রয়েছে কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা। জাহিদুর রহমান নামের এক তরুণ ভোটার বলেন, শিক্ষিত তরুণদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রার্থী যেই হোক, এই বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে তাকেই ভোট দেবেন তারা।
বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন মনে করেন, এই আসনে বস্তিবাসীদের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। গুলশানের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এলাকার নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিএনপির দাবি, তারেক রহমান অন্তত ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হবেন। ইতোমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে আবদুস সালামকে। তিনি জানান, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরপরই তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করবেন, যার সূচনা হবে সিলেট থেকে।
জামায়াতের নেতারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির জনসমর্থন বেড়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান বিজয়ী হবেন বলে আশাবাদী তারা। খালিদুজ্জামান বলেন, জামায়াত একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে চায় এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার। নারী ও পুরুষ ভোটার প্রায় সমান, তবে পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার ১৬ হাজার কম।
এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও আরও কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তাজনূভা জাবীন দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হয়েছেন তপু রায়হান, প্রতীক বাইসাইকেল। এছাড়া কামরুল হাসান নাসিম (বিজেপি) ও কাজী এনায়েত উল্লাহ (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তবে তাদের নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তেমন আলোচনা নেই।
সব মিলিয়ে ঢাকা-১৭ আসনে এবারের নির্বাচন হয়ে উঠেছে মর্যাদা, রাজনৈতিক শক্তি ও গণভিত্তির বড় পরীক্ষা। অভিজাত আর বস্তিবাসী ভোটের সমীকরণই নির্ধারণ করবে কে হবেন এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...