Logo Logo

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার

নারীর নিরাপত্তা, বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি জামায়াতের


Splash Image

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত হোটেল শেরাটনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে দলের নির্বাচনী ইশতেহার, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’।


বিজ্ঞাপন


ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

‘প্রতিশ্রুতি নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা’

দলটির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, এবারের ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সমন্বিত ঘোষণাপত্র হিসেবে এটি উপস্থাপন করা হবে। তারা বলছেন, সহানুভূতির রাজনীতি নয়—অধিকার, ন্যায্যতা ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনাই হবে ইশতেহারের মূল ভিত্তি।

দুর্নীতিমুক্ত শুদ্ধাচার, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ও ঋণ সুবিধা, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

জনমতের ভিত্তিতে ইশতেহার

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার-মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি জনমত গ্রহণের উদ্যোগ হিসেবে ‘জনতার ইশতেহার’ ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়। গত ১০ ডিসেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর থেকে প্রায় ৩৭ হাজারের বেশি মতামত পাওয়া গেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মতামতগুলো এসেছে জাতীয় খাতভিত্তিক, ৩০০ সংসদীয় আসনভিত্তিক, পেশাভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক ক্যাটাগরি থেকে। লিখিত মতামতের পাশাপাশি অডিও ও ভিডিও বার্তাও জমা পড়েছে। এসব পরামর্শ বিশ্লেষণ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেকারত্বকে ‘সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকট’

জামায়াত দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকট হিসেবে বেকার যুবসমাজকে চিহ্নিত করছে। বিভিন্ন জনসভায় দলটির আমির বলেছেন, সীমান্তে নয়—রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি লুকিয়ে আছে কর্মহীন তরুণদের হতাশায়।

দলীয় পলিসি ডায়ালগে জানানো হয়েছে, শিল্প, কৃষি, আইটি ও সেবা খাতকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনলে আগামী পাঁচ বছরে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। জেলা পর্যায়ে কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত স্টার্টআপ তহবিল এবং ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব থাকছে ইশতেহারে।

নারী ইস্যুতে নিরাপত্তা ও মর্যাদার অগ্রাধিকার

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত নিরাপত্তা ও সম্মানকে প্রাধান্য দিচ্ছে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, কেবল কাগুজে ক্ষমতায়ন নয়—কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ডে-কেয়ার সুবিধা এবং নারী-শিশু নির্যাতনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই হবে লক্ষ্য।

‘সমতা নিশ্চিতকরণ: নারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে উপস্থাপিত প্রস্তাবে গার্মেন্টসহ শিল্পখাতে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হয়। গ্রামীণ নারীদের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও গৃহভিত্তিক শিল্পে প্রশিক্ষণের কথাও রয়েছে।

কৃষিতে ন্যায্যমূল্য ও ভর্তুকির বিকল্প ভাবনা

কৃষকদের মর্যাদা রক্ষায় ভর্তুকিনির্ভরতা কমিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কথা বলছে জামায়াত। ইশতেহারে উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করে ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা, সুদমুক্ত কৃষিঋণ, ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার নির্মাণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা এবং রপ্তানি সহায়তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে।

সার ও বীজ সরবরাহে সিন্ডিকেট ভেঙে সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে সোলার সিস্টেম আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ব্লু ইকোনমি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল

সমুদ্র অর্থনীতিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরছে দলটি। মৎস্য, জাহাজ নির্মাণ, নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক পর্যটনকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনার কথা বলা হচ্ছে। আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র ও উপকূলভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের প্রস্তাব থাকতে পারে ইশতেহারে।

এছাড়া অঞ্চলভেদে ইকোনমিক জোন গড়ে তুলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার কথাও থাকছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কার

সামাজিক নিরাপত্তাকে ‘দয়া’ নয়, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছে জামায়াত। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য স্বচ্ছ ও কাঠামোগত সংস্কারভিত্তিক কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি থাকছে।

প্রশাসনিক কাঠামোয় দুর্নীতি রোধ ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্মানজনক বেতন ছাড়া দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়া সম্ভব নয়।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও করনীতি

ব্যবসায়ীদের জন্য উৎকোচমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। ক্ষমতায় গেলে আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি না করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

করনীতির বিষয়ে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নতুন করে কর আরোপ নয়—বর্তমান কর আদায় নিশ্চিত এবং দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করাই লক্ষ্য। তার দাবি, কর ফাঁকি ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, ‘জনতার ইশতেহার’-এ স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার তুলে ধরতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...