Logo Logo

টুঙ্গিপাড়ায় নববধূর মুখে বিষ ঢেলে হত্যার অভিযোগ ৬ লাখে মিমাংসা


Splash Image

মৃত তন্নীর মা শরিফা বেগম এখনো মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে কাঁদছেন।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন ও মুখে বিষ ঢেলে নুসরাত হোসেন সানজিদা ওরফে তন্নী (১৮) নামের এক নববধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। তবে ঘটনার কয়েকদিন পরই স্থানীয় কয়েকজনের উপস্থিতিতে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে হত্যার অভিযোগ ‘মিমাংসা’ করার বিষয়টি সামনে আসায় এলাকাজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


জানা যায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তন্নীর মৃত্যু হলে সাংবাদিকদের কাছে তার বাবা জাহাঙ্গীর খান অভিযোগ করেন, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের দাবিতে তার মেয়েকে নির্যাতন করে এবং কয়েকজন মিলে মুখে বিষ ঢেলে হত্যা করেছে।

কিন্তু পরবর্তীতে গত ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচজন স্থানীয় ব্যক্তি ও গোপালগঞ্জের এক আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে লিখিতভাবে নববধূর শ্বশুর জাফর খানের সঙ্গে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে হত্যার বিষয়টি আপোষ-মিমাংসা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার চর-গোপালপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর খানের মেয়ে তন্নীর সঙ্গে একই গ্রামের জাফর খানের ছেলে আরিফুল খানের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রায় এক মাস আগে রাতের বেলায় আরিফুল তন্নীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে গ্রামবাসী তাদের ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়। এরপর আরিফুল তন্নীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়নি।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি তন্নী নিজের ইচ্ছায় স্বামীর বাড়িতে যায়। পরদিন সে বাবার বাড়িতে এসে জানায়, শ্বশুরবাড়ির পাশে দুই বিঘা জমি লিখে দিতে হবে। ওইদিনই আবার সে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যায়। পরের দিন নির্যাতন ও মুখে বিষ ঢেলে তন্নীকে বাবার বাড়ির সামনের রাস্তায় ফেলে রেখে যায় স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা—এমন অভিযোগ পরিবারের।

পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তন্নীর মৃত্যু হলে তার বাবা অভিযোগ করেন, চার থেকে পাঁচজন মিলে তার মেয়েকে শারীরিক নির্যাতন করে মুখে বিষ ঢেলে হত্যা করেছে।

তবে ঘটনার কয়েকদিন পর তারাইল-চরগোপালপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর শিকদার, সোহেল শেখ, টুটুল শিকদার এবং পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়ার সোনাখালী এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ারসহ উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে ৬ লাখ টাকায় বিষয়টি মিমাংসা করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

মিমাংসায় উপস্থিত থাকা টুটুল শিকদার বলেন, “মৃত তন্নীর বাবা হঠাৎ আমাকে বলেন গোপালগঞ্জ যেতে হবে। সেখানে গিয়ে দেখি গোপালগঞ্জের অ্যাডভোকেট রবিউল আলমের কার্যালয়ে বসে তন্নীর বাবা হত্যার বিষয়টি ৬ লাখ টাকায় লিখিতভাবে আপোষ করেন। শ্বশুর জাফর খানের কাছ থেকে নগদ ৬ লাখ টাকা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকে গিয়ে জমা দেন। এতে আমার কোনো স্বার্থ নেই, এলাকার লোক হিসেবে ডেকেছিল তাই গিয়েছিলাম।”

তবে এই ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারাইল-চরগোপালপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, “একটি হত্যাকাণ্ড যদি ৫-৬ লাখ টাকায় মিমাংসা করা যায়, তাহলে দেশে আইনশৃঙ্খলা থাকবে কীভাবে? যে কেউ কাউকে হত্যা করে টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে যাবে, আর অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে।”

এ বিষয়ে তন্নীর বাবা জাহাঙ্গীর খান বলেন, “এলাকার লোক অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু এখনো কোনো মিমাংসা হয়নি। আপনারা (সাংবাদিক) নম্বর দিয়ে যান, মিমাংসা হলে আমি যোগাযোগ করব।”

অন্যদিকে তন্নীর মা দাবি করেন, তার স্বামীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার স্বামীকে নানা রকমভাবে ভয় দেখিয়েছে ওরা। তাই সে ভয়ে মিমাংসা করতে চাইছে। শুনেছি ৬ লাখ টাকার কথা হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা সে নিয়েছে কিনা জানি না, আমাকে বলেনি। আর টাকা নিয়ে কি আমার মেয়ের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই।”

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, “বাংলাদেশে আইনত টাকার বিনিময়ে হত্যা মামলা আপোষ-মিমাংসার কোনো সুযোগ নেই। এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। হত্যার মতো অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী বলেন, “ওই ঘটনায় টুঙ্গিপাড়া থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে হত্যা মামলা দায়ের করা হবে। আইনগতভাবে হত্যার মতো ঘটনায় কোনো আপোষ-মিমাংসার সুযোগ নেই।”

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...