প্রতিকী ছবি - এআই
বিজ্ঞাপন
বলছিলাম উপকূলীয় উপজেলা বরগুনার পাথরঘাটার কথা। ছগির হোসেন, আলতাফ মিয়া, হায়দার আলী, এমাদুলের মতো এ উপজেলায় অধিকাংশ মানুষই মৎস্য কাজের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের মায়া ছেড়ে নিরাকার অথৈ সাগরে জীবন বাজি রেখে মৎস্য শ্রমিক (জেলে) বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেন। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৫০ শতাংশ। মৎস্য শ্রমিকদের জিডিপিতে এতো অবদান থাকলেও আজও শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি। এমনকি শ্রমিক হিসেবে মে দিবসেও তাদের কোন কদর নেই।
জীবন বাজি রেখে যারা প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধ করে মাছ শিকার করছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয়। এক রকম আক্ষেপ করেই বললেন ‘মোগো মে দিবস নাই, মোগো কোন দিবস নাই, মে দিবস আবার কি?’
কথা হয় আবদুর জব্বারের সাথে। তিনি বলেন, ৪২ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরি। জীবন বাজি রেখে পরিবারের কাছ থেকে মায়া ছেড়ে সাগরে যাই। কতবার যে বন্যায় ডুইবা গ্যাছি তার হিসাব নাই, জীবন-মরণ কয়েকবার দেইখ্যা আইছি। এখন বুড়া হইয়া গ্যাছি, এখনো জীবনের ঝূকি নিয়া সাগরে মাছ ধরতে যাই।
আজ সোমবার (১ মে) শ্রমিকদের জন্য প্রতি বছর এ দিন 'মে' দিবস পালিত হয়ে থাকে। এ বিষয় জেলে ছগির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিবস দিয়া কি অইবে...। মোগো কাজই বড়। কাজ না করলে খামু কি? ঝুকি নিয়া সাগরে মাছ শিকার করি, আবার কুলে আইসা জাল বুনি। সারাদিন জাল বুনে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা পাই। তাও আবার সব সময় পাই না।
ওপর জেলে মো. ফারুক বলেন, সাগরে যাই মাছ ধরতে দাদন নিয়া, মাছ পাইলে ১৬ ভাগের ৮ ভাগ মালিকের আর ৮ ভাগ, ৮ থেকে ১৮ জন জেলের মাঝে উপার্জনের ওপর বন্টন হয়। বাজার সদায়ের খরচ শেষে লাভ থাকলে ভাগে টাকা পাই, লোকশান থাকলে পাই না। মোরা যে এতো কষ্ট কইরা মাছ শিকার করি আজ পর্যন্ত শ্রমিক হিসেবে মোগো কেউ দ্যাহে না।
পাথরঘাটা উপজেলায় অধিকাংশ মানুষ জেলে পেশায় নিয়োজিত। কিন্তু এসব জেলেদের শ্রমিক হিসেবে কেউ ডাকেনা, তাদের শ্রমিক হিসেবে মুল্যায়ন করেনা।
এ ব্যাপারে জাতীয় শ্রমিক লীগের পাথরঘাটা উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুল আউয়াল বলেন, দলীয়ভাবেও জেলে শ্রমিকদের দলে বিবেচনা করা হয়না। আমি বিগত কয়েক বছর ধরে মৎস্য শ্রমিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার ষ্টাডিজের (বিলস) গবেষক এস.এম. জাকির হোসেন বলেন, উপকূলের মৎস্য শ্রমিক (জেলে) জীবনের ঝূকি নিয়ে মাছ শিকার করছেন। কখনো জলদস্যূদের কবলে প্রাণ হারায়, কখনো দুর্যোগেও প্রাণ হারাতে হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের শ্রমিক হিসেবে স¦ীকৃতি দেয়া হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স¦ীকৃতি এবং সরকারি সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা পেতে সর্বোচ্চ মহলে লিয়াজো করে আসছি।
তিনি আরও বলেন, এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো জেলেদের কোন কর্মঘন্টা নেই। সাগরে থাকাকালীন চব্বিশ ঘন্টাই কাজ করে তারপরও তারা শ্রমিক নয়।
উপকূলের জেলেদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, মৎস্য সেক্টরের সাথে জড়িত শুধু মাছ ধরা শ্রমিকরাই নয়, জাল বুনা, ট্রলার মেরামত করা, বরফ তৈরী করার কাজে নিয়োজিত উপকূলের হাজারো শ্রমিক। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান জেলেদের থাকলেও সরকারের উচ্চ পর্যায় তাদের নিয়ে গবেষণা তো দূরের কথা তারা যে শ্রমিক এটাও সরকারের ধারণাই নেই। অথচ প্রতিনিয়তই এসব শ্রমিকরা সাগরে ট্রলার ডুবে, জলদস্যূদের গুলিতে মারা যায়।
তিনি আরও বলেন, নগর মহানগরে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্যতা নিয়ে যতটা আলোচিত হয়েছে বা তাদের ন্যায্যতা প্রাপ্তির েেত্র যতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে উপকূলের জেলেদের কাছে কতটুকু পৌঁছাতে পেরেছে এ মুহুর্তে সেটি মুখ্য বিষয় নয়। এ অঞ্চলের জেলে শ্রমিকরা আদৌ শ্রমিক কিনা, শ্রমিক হলে তাদের প্রাপ্যতার বিষয় কতটুকু জানলো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জেলেদের শ্রমিক হিসেবে স¦ীকৃতি দেওয়ার এখনই সময়। একটি পরিসংখ্যানে সরকারি তথ্যানুযায়ী গত ৭ বছরে বৈরি আবহাওয়ায় বরিশাল বিভাগে সমুদ্রগামী ২৫৯ জেলের মৃত্যু। বেসরকারি হিসেবে এর চেয়ে অনেক বেশি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...