বিজ্ঞাপন
কয়েক দিন আগেও যেখানে হাওরজুড়ে পাকা ধানের সোনালি ঢেউ দুলছিল, সেখানে এখন শুধুই থৈ থৈ পানি। বাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে পড়া পানিতে জেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ডুবে গেছে। এতে করে কৃষকের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। হতাশা আর শঙ্কায় দিন কাটছে হাওরপাড়ের মানুষের।
জেলার সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার, ছাতক, দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রায় সব হাওরেই একই চিত্র বিরাজ করছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে, আবার কোথাও নদীর উপচে পড়া পানিতে জমির পর জমি ডুবে গেছে। চারদিকে শুধু ডুবে যাওয়া ফসল আর অসহায় কৃষকের আর্তনাদ।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে প্রতিকূল আবহাওয়া, দ্রুত বাড়তে থাকা পানির উচ্চতা এবং শ্রমিক সংকট। বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক না আসায় ধান কাটার কাজ প্রায় বন্ধ। অন্যদিকে পানিতে তলিয়ে থাকা জমিতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র—কম্বাইন হারভেস্টার বা রিপার—চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা বুকসমান পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা করেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফসল রক্ষা করতে পারছেন না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, উজানে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো রক্ষায় পাউবোর প্রকৌশলী ও কর্মীরা স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে দিনরাত কাজ করছেন। অনেক স্থানে বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, যেসব স্থানে ফাটল বা ধস দেখা দিচ্ছে, সেখানে জিও ব্যাগ, বাঁশসহ স্থানীয় উপকরণ দিয়ে জরুরি মেরামতের চেষ্টা চলছে। তবে পানির উচ্চতা দ্রুত না কমলে বাঁধের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে না।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উমর ফারুক জানান, আকস্মিক এই দুর্যোগে জেলার কৃষি খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল এত দ্রুত এসেছে যে নিচু এলাকার কৃষকরা ফসল ঘরে তোলার সুযোগই পাননি। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র নিরূপণে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান বলেন, শুরু থেকেই ফসল রক্ষা বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাহাড়ি ঢলের তীব্র চাপে কিছু এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং ত্রাণ ও কৃষি সহায়তা দ্রুত বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী, প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীকে মাঠে নামানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ফসলহীন উঠানে বসে কৃষাণীরা দূরে তাকিয়ে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন—ঋণ শোধ, সংসার চালানো ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা।
জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই ধান কাটা ও মাড়াই কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অবশিষ্ট ফসলও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে করে শুধু কৃষক নয়, পুরো জেলার অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সরাসরি প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হাওর ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কারণ, হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবনযাত্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। হাওরের এই বিপর্যয় তাই সামগ্রিকভাবে দেশের জন্যই এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...