Logo Logo

টুঙ্গিপাড়ায় প্রধান শিক্ষকের অবহেলায় ২৬৭ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি অনিশ্চিত


Splash Image

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও বিলবেষ্টিত গ্রাম গোপালপুরের অধিকাংশ মানুষ দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, জেলে কিংবা ভ্যানচালক। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের উপবৃত্তি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে রেজিস্ট্রেশন জটিলতায় গোপালপুর পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়ের টানা দুই শিক্ষাবর্ষের মোট ২৬৭ শিক্ষার্থী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন


অভিভাবকদের অভিযোগ, ২০২৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ১২১ জন এবং ২০২৫ সালে ভর্তি হওয়া আরও ১৪৬ জন শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির জন্য প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। ফলে এসব শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তি পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের এককালীন এক হাজার টাকার সহায়তাও তারা পাবে না।

এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদারের অবহেলাকে দায়ী করেছেন অভিভাবকরা। একই সঙ্গে চলতি বছরে বিদ্যালয়ের মাসিক টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে, যা দরিদ্র পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্যামল ব্যাপারীর বাবা শান্তি ব্যাপারী বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের মোট ২৬৭ শিক্ষার্থী উপবৃত্তির বাইরে চলে গেছে। তার দাবি, প্রত্যেক শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ বছরে ১৬ হাজার টাকা করে উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হবে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ৪২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে গাফিলতির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেতন ও বিভিন্ন ফি বৃদ্ধির কারণে দরিদ্র পরিবারের জন্য সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা মহলীর বাবা অধীর মহলী বলেন, প্রায় দুই বছর আগে সহকারী প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে অনিয়ম বেড়েছে। তার অভিযোগ, শিক্ষা কার্যক্রমের পরিবর্তে নানা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যস্ত থাকায় শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো উপেক্ষিত হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবরাজ মহলীর মা ঝর্না মহলী বলেন, অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পেলেও তার সন্তান পায়নি। বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও কেন উপবৃত্তি পাওয়া গেল না, সে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার ভাষায়, দরিদ্র পরিবারের জন্য এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বপন তালুকদার জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সে কোনো উপবৃত্তি পায়নি। কৃষিশ্রমিক বাবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে এই অর্থ বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

একইভাবে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী পর্শি তালুকদার জানায়, তার বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। উপবৃত্তি না পাওয়া এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফি বৃদ্ধি পাওয়ায় তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিল্টন তালুকদার বলেন, বিদ্যালয়টি দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত। শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পেলে তাদের পড়াশোনায় অনেক উপকার হয়। তিনি দাবি করেন, গত বছর শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আবেদন করা হলেও সার্ভার সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে তারা উপবৃত্তি পায়নি। এ বছরও নির্ধারিত সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি একাধিকবার শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং গত মাসে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। সে সময় রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে উপবৃত্তির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

মিল্টন তালুকদার আরও বলেন, বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের যেন উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনা কামনা করছেন। তবে বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম তালুকদার বলেন, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। একজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৫ আগস্টের পর থেকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও নেই। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা ধরনের অনিয়ম দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, ২০২৬ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আবেদন বিষয়ে জানুয়ারি মাস থেকেই প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিক নির্দেশনা ও চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার ফোনেও যোগাযোগ করা হয়। এমনকি জুন মাসে চূড়ান্ত আবেদন জমা দেওয়ার সময়ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তথ্য এখনো ডাটা এন্ট্রি না হওয়ার বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে জানানো হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়া উপবৃত্তির আবেদন সম্ভব নয়। বোর্ডের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যেহেতু পুরো কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য এন্ট্রি বাধ্যতামূলক, তাই এবার এসব শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতেও তারা নতুন করে ষষ্ঠ শ্রেণির উপবৃত্তির আবেদন করতে পারবে না, কারণ এই সুবিধার জন্য আবেদন করার একমাত্র সুযোগ থাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময়।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, গোপালপুর পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে প্রশাসন অবগত রয়েছে। বিষয়টি জানার পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি ফি নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে ফি কমানোর চেষ্টা করা হবে। চলতি বছরের উপবৃত্তির সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় এবার বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার সুযোগ না থাকলেও আগামী বছর যাতে তারা সময়মতো উপবৃত্তির আওতায় আসে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলা পরিষদের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার সুযোগ থাকলে সেটিও নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...