বিজ্ঞাপন
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বাসন্ডা নদীর ওপর প্রায় ৩৯৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের এই বেইলি সেতুটি নির্মাণ করা হয়। বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগ সেতু দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ ভারী যানবাহনসহ অসংখ্য ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যোগাযোগ, কৃষিপণ্য, মাছ, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট।
তবে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সেতুর স্টিলের পাটাতন ফেটে যাওয়া, নাট-বল্টু ঢিলা হয়ে পড়া এবং বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত। এসব সমস্যা সমাধানে সময়ে সময়েই ঝালাই, স্টিলের প্লেট পরিবর্তন এবং নাট-বল্টু টাইট করার মতো সাময়িক সংস্কার করা হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০১৬ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন কোনো স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হয়নি। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যদি সেতুটি ধসে পড়ে, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যদিও সওজের প্রকৌশলীরা নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে সেতুটি সচল রাখার চেষ্টা করছেন, তবে ভারী যানবাহনের চাপ এতটাই বেশি যে নতুন করে বসানো স্টিলের প্লেটও অল্প সময়ের মধ্যে বাঁকিয়ে যায় কিংবা ফেটে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে নতুন সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। অথচ বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম।
খুলনা-বরিশাল রুটের ট্রাকচালক মো. রুস্তম আলী বলেন, “প্রতিবারই লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে, অথচ স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বছরের পর বছর কাগজেই সীমাবদ্ধ।”
যাত্রীবাহী বাসচালক আব্দুর রহমান বলেন, “প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। গাড়ি উঠলেই সেতু কাঁপতে থাকে। দুর্ঘটনার ভয় নিয়েই চলতে হয়। জোড়াতালির পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় না করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা উচিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা নাছির উদ্দীন বলেন, “ব্রিজের ওপর দিয়ে ভারী গাড়ি চললেই বিকট শব্দ হয়। পুরো ব্রিজ দুলতে থাকে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতুটি ভেঙে গেলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত নতুন সেতু চাই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নতুন সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তবে ২০২৬ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানিয়েছে, বাসন্ডা বেইলি সেতুর পরিবর্তে নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান বলেন, “বাসন্ডা বেইলি সেতুর পরিবর্তে নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন পেলেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”
এদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুকে ঘিরে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক মানববন্ধন করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রায় এক দশক ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা, অসংখ্যবার সংস্কার, কোটি কোটি টাকার জোড়াতালি এবং একের পর এক আশ্বাস—সবকিছুর পরও বাসন্ডা বেইলি সেতুর ভাগ্যে জোটেনি স্থায়ী সমাধান। প্রতিদিন শত শত ভারী যানবাহনের চাপ নিয়ে কাঁপতে থাকা এই সেতু এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই বাসন্ডা বেইলি সেতুর পরিবর্তে আধুনিক, টেকসই ও স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...