বিজ্ঞাপন
মামলার বাদীর অভিযোগ, মামলা দায়েরের পরও প্রধান আসামিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-তে হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
মামলার নথি ও বাদীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুর উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. তাজিল মিয়ার ছেলে কামরুজ্জামানকে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে একটি মানবপাচারকারী চক্র তার পরিবারের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করে। অভিযুক্তরা নিজেদের বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম বলে পরিচয় দিয়ে এক মাসের মধ্যে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে তিনটি স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করে দুই দফায় মোট ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ করে। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতালিতে পাঠানোর পরিবর্তে কামরুজ্জামানকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে দীর্ঘদিন অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে তাকে মুক্তি দেওয়ার শর্ত হিসেবে পরিবারের কাছে আরও ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, পরে দুবাইপ্রবাসী তার ভাই মো. নুরুজ্জামান হোসেন বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাকে লিবিয়া থেকে উদ্ধার করে দুবাইয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে অভিযুক্তদের কাছে ১৫ লাখ টাকা ফেরত চাইলে তারা টাকা না দিয়ে উল্টো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দিতে শুরু করে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাই মো. নুরুজ্জামান হোসেন বাদী হয়ে সুনামগঞ্জের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে বিষয়টি জগন্নাথপুর থানায় পাঠানো হলে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। মামলাটি জগন্নাথপুর থানার মামলা নম্বর-১২, তারিখ ১৪ জুলাই ২০২৬।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানার হাওলাদারপাড়া এলাকার শিপন আহমদকে। এছাড়া দিরাই উপজেলার ফজলুর রহমান, রহমানসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর স্থানীয় থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাদী। তার অভিযোগ, তদন্তে গড়িমসি করা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। জেলা পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নুর হোসেন অভিযুক্তদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে অনীহা দেখাচ্ছেন।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, প্রধান আসামি শিপন আহমদ আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তিকে ব্যবহার করে তিনি তদন্ত কার্যক্রম প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব কারণে থানা পুলিশের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয় উল্লেখ করে মামলাটি দ্রুত জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-তে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছেন বাদী।
তবে তদন্তে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জগন্নাথপুর থানার এসআই নুর হোসেন বলেন, “অভিযোগটি আমার কাছে রয়েছে। আমি বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অন্যদিকে, মামলার প্রধান আসামি শিপন আহমদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি আদালতেই মোকাবিলা করব।”
মামলার চার নম্বর আসামি ফজলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। পরে কথা বলব।” এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধে মামলা দায়েরের পরও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একই সঙ্গে মামলার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)-র মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...