বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও এক শ্রেণির ভ্রমণপিপাসু নির্ধারিত নিয়মকানুন মানছেন না। এর ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, ব্যাহত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও জনজীবন। তাদের মতে, শুধু সতর্কীকরণ নয়, নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুতগতির ট্রলারের কারণে পেয়ারা বোঝাই কৃষকদের ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে কিছু কিশোর পর্যটকের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণেও প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভিমরুলী ভাসমান হাটে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। এ সময় অনেক ট্রলারে উচ্চমাত্রার সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হয়। দ্রুতগতির ট্রলারের সৃষ্ট ঢেউয়ে পেয়ারা বোঝাই কয়েকটি ডিঙি নৌকা ডুবে যায়। এর আগে গত ১৭ জুলাই কিশোর পর্যটক সানি (১৩) আমগাছ থেকে খালে লাফ দিয়ে নিখোঁজ হলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পর্যটকদের বেপরোয়া আচরণ ও নিরাপত্তাবিধি না মানার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে।
এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং পরিবেশ, প্রকৃতি, শৃঙ্খলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রশাসন একটি নির্দেশনামূলক নোটিশ জারি করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলী পেয়ারা বাগান ও ভাসমান পেয়ারা বাজার ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ, ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স এবং স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, পেয়ারা বাগান পরিদর্শনের সময় ডিজে সিস্টেম, লাউডস্পিকার ও উচ্চ ভলিউমের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ উচ্চশব্দ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া ইঞ্জিনচালিত বড় ট্রলার নিয়ে ভাসমান পেয়ারা বাজার বা বাগানের ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। বড় ট্রলারের কারণে বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যটকদের ছোট ও মাঝারি আকারের ইঞ্জিনবিহীন নৌযান ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে বাগানের পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় থাকে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, পর্যটকদের সঙ্গে আনা খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিক, বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য পানিতে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিটি নৌযানে অন্তত একটি করে ডাস্টবিন রাখতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি ট্রলার বা নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে চালক ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে কোনো ট্রলার বা নৌযান চলাচল করতে পারবে না। অনুমতি ছাড়া পেয়ারা বাগানে প্রবেশ, পেয়ারা বা আমড়া সংগ্রহ এবং গাছের ডালপালা ছেঁড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পর্যটকদের শালীনতা বজায় রাখা, ইভটিজিং থেকে বিরত থাকা এবং আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সব বিধি-বিধান মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, “আসুন সবাই মিলে ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারা বাগানের পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব রাখি। এ বাগান আমাদের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় সবাই সচেতন হই। পর্যটন এলাকার সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সকলের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।” জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নির্দেশনা জারির পরও অনেক পর্যটক তা মানছেন না। অনেকেই নৌযানে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে, অশোভন আচরণ ও অশালীন নৃত্যে মেতে উঠে শব্দদূষণ সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি ব্যবহৃত প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, খাবারের মোড়কসহ বিভিন্ন বর্জ্য খাল, নদী ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণ করছেন। এতে পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত নৌচলাচল এবং প্রশাসনের জারি করা বিধিনিষেধ অমান্যের কারণে পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও নৌযানচালকেরা। তাদের ভাষ্য, পর্যটকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে কৃষকেরা ঝুঁকি নিয়ে পেয়ারা পরিবহন করছেন এবং প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, শুধু নোটিশ বা সতর্কীকরণে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, এতে পর্যটন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং দর্শনার্থীরাও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, “পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পর্যটনের আকর্ষণ ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যথায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, বেপরোয়া ট্রলার চলাচল, শব্দদূষণ ও পরিবেশদূষণের কারণে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় এই প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...