বিজ্ঞাপন
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার বিবরণী সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতার অনুসারীদের মধ্যে পুরোনো বিরোধের জেরে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ভুক্তভোগীর বন্ধু মোহাম্মাদ হাবিবুল্লাহ জানান, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ফোকলোর বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আছিমুল খানের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ দল নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিব ও তাঁর বন্ধুদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার একপর্যায়ে লাবিবকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি হাতুড়িপেটা করা হয়। হাতুড়ির নির্মম আঘাতে তাঁর মাথা ফেটে যায় এবং বুকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জখম হয়। সহপাঠীরা তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁর মাথায় ৬টি সেলাই দেন। তবে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় রাতেই তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের জরুরি পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাসপাতালে স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সময় ঘটে আরেক চরম অমানবিক ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, গুরুতর আহত লাবিবকে ময়মনসিংহে নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা শাহাবুল আলম। তিনি দলবল নিয়ে জোরপূর্বক আহত শিক্ষার্থীকে নিজস্ব মোটরসাইকেলে তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের বাইরের একটি গোপন আড্ডাস্থলে নিয়ে যান এবং ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ ও চাপের মুখে লাবিবকে হলের সামনে ফেলে রেখে তারা সটকে পড়ে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও অ্যাম্বুলেন্স চালক মনির হোসেনকে হুমকি দিয়ে পরিবহন সেবা ব্যাহত করার অভিযোগ উঠেছে ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।
এদিকে গভীর রাতে সংঘাতের খবর পেয়ে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রক্টরের উপস্থিতিতেই ছাত্রদল নেতাকর্মীদের একটি পক্ষ চরম ঔদ্ধত্য দেখায় এবং প্রশাসনিক নির্দেশ উপেক্ষা করে তাঁকে প্রকাশ্যে নানাভাবে অবজ্ঞা করে কথা বলে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সম্প্রতি ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের পর থেকেই ক্যাম্পাসে একের পর এক মারামারি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডি কোনো কার্যকর ও বলিষ্ঠ আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বহিষ্কৃত যুবদল নেতা শাহ মো. সাহাবুল আলমের অব্যাহত দৌরাত্ম্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের চলমান উন্নয়ন কাজে চাঁদা দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, সাবেক সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের এবং সম্প্রতি ত্রিশাল বাজারে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে মারধরের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
উদ্ভট ও সংঘাতময় পরিস্থিতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, রাতে ক্যাম্পাসে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছিল, তবে প্রক্টরিয়াল টিম পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বর্তমানে শান্ত রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মামুন সরকার বলেন, তিনি সংঘাতের সূচনালগ্নে ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না; পরবর্তীতে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেন। ক্যাম্পাসে কোনো মারামারি বা অরাজকতা সমর্থনযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল হয়তো ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে। তবে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিব আহমেদ বলেন, ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো সুযোগসন্ধানী বা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কোনো অনুপ্রবেশকারী যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বারবার এমন সহিংসতা, প্রশাসনিক অসহায়ত্ব এবং বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যের মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে; তাঁরা অবিলম্বে হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...