বিজ্ঞাপন
জেলার সবচেয়ে বড় আমড়ার বাজার হিসেবে পরিচিত ভীমরুলীর ভাসমান হাটে এখন প্রতিদিনই বসছে নৌকার সারি। পানিতে ভাসমান নৌকায় সাজিয়ে রাখা হচ্ছে টাটকা আমড়া। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা এসব আমড়া কিনে নৌ ও সড়কপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। ফলে শুধু কৃষকরাই নন, আমড়াকে ঘিরে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে শত শত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর।
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার চার উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৬০৫ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয়েছে। এ বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন আমড়া, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, দুই বছরের ব্যবধানে আমড়ার আবাদ ও উৎপাদন দুটিই বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলায় ৬০২ হেক্টর জমিতে আমড়ার আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৪ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে তিন হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়েছে ৫২০ মেট্রিক টন।
পেয়ারা মৌসুমের পর ভাদ্র মাসের মধ্যে সময় জমতে শুরু করে আমড়ার বাজার। টানা প্রায় দুই মাস জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলে আমড়ার বেচাকেনা। তবে এর মধ্যে ভীমরুলীর ভাসমান হাটটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত এই হাটে নৌকায় করে আমড়া নিয়ে আসেন চাষিরা। একদিকে চলছে দরদাম, অন্যদিকে নৌকা থেকে নৌকায় আমড়া তোলা ও বাছাইয়ের কাজ।
বর্তমানে মৌসুমের শুরুতে আকার ও রংভেদে প্রতি মণ আমড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও মানভেদে এর দাম এক হাজার টাকার কাছাকাছিও নেমে আসে। ফলে ভালো মানের আমড়া উৎপাদন করতে পারা কৃষকরা তুলনামূলক বেশি দাম পাচ্ছেন।
চাষি ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমড়ার আকার, রং ও মানের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়। প্রতি মণে দুইশ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে পাইকারদের। তবে শ্রমিক, পরিবহন ও খাবারের খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভ আরও কমে আসে।
কৃষকদের অনেকেই বলছেন, পেয়ারা চাষে উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ নেই। অন্যদিকে আমড়ার পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ এবং উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এটি কৃষকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আমড়া চাষি সুজন হালদার শানু জানান, তার ছয় বিঘা জমিতে আমড়ার বাগান রয়েছে। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে প্রায় চার হাজার টাকার আমড়া পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে ছয় বিঘা জমি থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন এই কৃষক।
কীর্তিপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও কৃষক ভবেন্দ্রনাথ হালদার বলেন, পেয়ারায় এখন আর আগের মতো লাভ নেই। চলতি বছর অনাবৃষ্টির কারণে পেয়ারার ফলনও ভালো হয়নি। তার ওপর পেয়ারায় ‘এনথ্রাক্স’ বা কালো ছিট রোগ দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, পেয়ারা পাকতে শুরু করলে প্রতিদিন গাছ থেকে পেড়ে বাজারে নিতে হয়। একজন শ্রমিকের পেছনে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হলেও অনেক সময় সেই শ্রমিক দিয়ে সংগ্রহ করা পেয়ারা বিক্রি করে পাওয়া যায় মাত্র ৪০০ টাকা। ফলে শ্রমিকের খরচই উঠে আসে না।
ভবেন্দ্রনাথ হালদারের ভাষ্য, এর তুলনায় আমড়ায় খরচ কম এবং লাভ বেশি। একটি গাছে তিন থেকে চার মণ পর্যন্ত আমড়া ধরছে। দুজন শ্রমিক ১০ থেকে ১২টি গাছের আমড়া পাড়তে পারেন। আবার প্রতিদিন গাছ থেকে আমড়া পাড়তে হয় না; পরিপক্ব হলে একদিনেই গাছের অধিকাংশ আমড়া সংগ্রহ করা যায়। এ কারণে কৃষকদের কাছে আমড়া চাষ বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, একটি বাতাবি লেবু বা জাম্বুরা গাছ থেকেও বছরে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
আমড়ার মৌসুমকে ঘিরে শুধু কৃষকের আয় নয়, কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন আমড়ার আড়ত ও হাটে প্রতিদিন কাজ করছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। কেউ নৌকা থেকে আমড়া নামাচ্ছেন, কেউ বাছাই করছেন, কেউ বস্তাবন্দি করছেন, আবার কেউ নৌকা ও ট্রাকে আমড়া তুলে দিচ্ছেন।
শতদশকাঠির একটি আমড়া আড়তে কাজ করা শ্রমিক রবিউল ইসলাম বলেন, এই মৌসুমকে ঘিরে অন্তত পাঁচ শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকরা দিনে ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমড়ার মৌসুমে দিনমজুরদের জীবন কিছুটা স্বস্তিতে কাটে। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ সময় কাজের চাপ ও আয় দুটোই বাড়ে।
স্থানীয় আড়তদার নিখিল হালদার জানান, চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় এক কোটি টাকার আমড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়েছেন। আমড়া বিক্রি থেকে পাওয়া আয় দিয়েই তার সারা বছরের অনেকটা খরচ চলে যায়। তার মতো আরও অনেক আড়তদার ও ব্যবসায়ী আমড়াকে কেন্দ্র করে সারা বছর অপেক্ষা করেন। মৌসুম শুরু হলে কৃষকদের কাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করে তা দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে সরবরাহ করেন তারা।
শুধু স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা প্রতিবছর ঝালকাঠিতে আসেন আমড়া কিনতে। স্বরূপকাঠির পাইকার নোমান বলেন, ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। তারা স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকায় পাঠান। প্রতি মণে প্রায় ২০০ টাকা লাভ থাকে। তবে শ্রমিক, পরিবহন ও খাবারের খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত লাভ থাকে প্রায় ১০০ টাকা।
রংপুর থেকে আসা পাইকারি ফল ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি প্রতিবছর ঝালকাঠি থেকে আমড়া কেনেন। দাম কিছুটা বেশি হলেও স্বাদের দিক থেকে ঝালকাঠির আমড়া সেরা।
জেলার বিভিন্ন হাট ও আড়ত থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমড়া যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নৌপথে ভীমরুলীর ভাসমান হাট থেকে আমড়া পৌঁছে যাচ্ছে স্থলভিত্তিক আড়তে। এরপর ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন পরিবহনে তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমড়ার চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলের আমড়ার স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর আলাদা কদর রয়েছে। আর সেই চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করছে ঝালকাঠির কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন খরচ কম, বাজারে চাহিদা বেশি এবং তুলনামূলক সহজ পরিচর্যার কারণে ঝালকাঠিতে আমড়ার আবাদ প্রতিবছর বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষিত ও বেকার যুবকরাও। ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের রোগবালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় আমড়ার উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় জেলার কৃষকদের মধ্যে এর চাষ বাড়ছে। একই সঙ্গে আমড়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমড়া দ্রুত পচে না যাওয়ায় এটি সংরক্ষণ ও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। ফলে কৃষকরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুম শেষে কৃষক পর্যায়ে প্রায় ১২ কোটি টাকার আমড়া বিক্রি হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষকদের ভাষায়, একসময় পেয়ারা বাগানই ছিল ঝালকাঠির অনেক এলাকার প্রধান ভরসা। এখন সেই বাগানে আমড়ার গাছ বাড়ছে। কম খরচে উৎপাদন, তুলনামূলক কম পরিচর্যা, বাজারে চাহিদা এবং ভালো দাম—সব মিলিয়ে আমড়া চাষ কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। ভীমরুলীর ভাসমান হাটে নৌকার পর নৌকা আমড়া আর আড়তগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা যেন সেই পরিবর্তনেরই চিত্র তুলে ধরছে। কৃষকের বাগান থেকে শুরু করে হাট, আড়ত, পরিবহন ও দেশের বিভিন্ন বাজার—পুরো একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রেখেছে মৌসুমি এই ফল।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি মৌসুমে ৬০৫ হেক্টর জমি থেকে ৪ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন আমড়া উৎপাদন এবং প্রায় ১২ কোটি টাকার বেচাকেনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে আমড়াকে ঘিরে শুধু ফলের বাজারই জমেনি, কৃষকের ঘরে ফিরছে বাড়তি আয়, সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান—আর ঝালকাঠির আমড়া ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাজারে।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...